

মিজানুর রহমান রানা :
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ, ঐতিহাসিক রেশমপথের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রান্ত—আজ বিশ্বে পরিচিত এক ভিন্ন কারণে: এখানকার সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চীনা সরকারের নিপীড়ন। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শুধু মাত্র হিজাব পরার অপরাধে নারীদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, নির্যাতন করা হয়, ইসলাম ধর্ম পালনের অপরাধে তাদেরকে হত্যা করা হয়।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
উইঘুররা মূলত তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। কয়েক দশক ধরে তারা চীনা সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বসবাস করলেও, ২০১৪ সালের পর থেকে “জাতীয় নিরাপত্তা” ও “সন্ত্রাস বিরোধী” অভিযানের নামে সরকারের আচরণ তাদের জীবনকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
বিশ্বজুড়ে নানা মানবাধিকার সংগঠন এবং সংবাদ মাধ্যম যেসব বিষয় তুলে ধরেছে তা অত্যন্ত গভীর ও উদ্বেগজনক:
– পুনঃশিক্ষা শিবির: আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে রাখা হয়েছে ‘পুনঃশিক্ষা শিবিরে’—যেখানে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বদলাতে বাধ্য করা হয়, চীনা কমিউনিস্ট আদর্শ শেখানো হয় এবং জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত করা হয়।
– ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ: মসজিদ ধ্বংস, কোরআন রাখার দায়ে গ্রেপ্তার, রমজানে রোজা রাখায় নিষেধাজ্ঞা—এসবই উইঘুরদের ধর্মীয় চর্চা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার দৃষ্টান্ত।
– নজরদারি ও প্রযুক্তি নির্ভর নিয়ন্ত্রণ: জিনজিয়াং পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে নজরদারিপূর্ণ অঞ্চলে। সেখানে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা, ফোন ট্র্যাকিং সফটওয়্যার এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে নাগরিকদের প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
-পরিবার বিচ্ছিন্নতা: অনেক বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়। শিশুরা সরকারি হোস্টেলে চীনা সংস্কৃতি ও ভাষা শিখছে, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয় ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক নির্মূলের ইঙ্গিত
চীন সরকার উইঘুরদের ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যকে “পিছিয়ে থাকা” বলে ঘোষণা দিয়ে একধরনের সাংস্কৃতিক একীভবনের প্রক্রিয়া চালিয়েছে। উইঘুর ভাষার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিগত নাম পরিবর্তনের চাপের মধ্য দিয়ে তারা হারাচ্ছে নিজেদের পরিচয়ের ভিত্তি।
নারী ও মানব মর্যাদার লঙ্ঘন
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে:
– নারীদের জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়
– কিছুক্ষেত্রে নির্বিচারে গর্ভপাত এবং বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি
– যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে শিবিরভিত্তিক নির্যাতনে, যেখানে নারীদেরকে প্রতি রাতে একজন পুলিশ এসে বস্ত্রহরণ করে সবার সামনে, তারপর ভিন্ন রুমে নিয়ে তাকে ধর্ষণে বাধ্য করা হয়, তার গর্ভে চীনা পুলিশের বীর্য প্রবেশ করানো হয়, যাতে তার গর্ভের সন্তান চীনা হয়ে জন্ম গ্রহণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা চীনকে এই নীতির বিষয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই কর্মকাণ্ডকে “গণহত্যা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, অন্যদিকে চীন এ সমস্ত অভিযোগকে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার পদক্ষেপ’ বলে ব্যাখ্যা করে।
উইঘুরদের আত্মপরিচয়: লড়াই এখনো চলছে
অন্তরালে চাপা পড়ে থাকা এই জনগোষ্ঠী এখনও আত্মপরিচয় রক্ষার চেষ্টা করছে। বিদেশে নির্বাসিত উইঘুর নেতারা, মানবাধিকার কর্মীরা এবং কিছু চীনা নাগরিকও এখন এই সংকটের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। সাহিত্য, গান, ভিজ্যুয়াল আর্ট ও সামাজিক মাধ্যম—সবকিছুতেই তারা চিত্রিত করছে নিজের নিপীড়নের ইতিহাস।
উপসংহার
উইঘুরদের জীবনে আজও ভোর আসে কিন্তু মুক্তির আলো পৌঁছায় না। তাদের গল্প কেবল জিনজিয়াংয়ের নয়, এটি বিশ্বজুড়ে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব রক্ষার গল্প। চীনা রাষ্ট্রের কঠোর নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি, নৈতিক অঙ্গীকার এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদের মাধ্যমে হয়তো একদিন উন্মোচিত হবে নিপীড়নের পর্দা।
শনি বার, ১২ জুলাই ২০২৫
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শেয়ার করুন










