নবীজি কি সর্বত্র বিরাজমান? কোরআন ও হাদীসের আলোকে সত্যের অনুসন্ধান

উপরের ছবি :একজন মুসলিম, যিনি সত্যের অনুসন্ধান করছেন

ইসলাম ডেস্ক : পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বত্র বিরাজমান থাকার ধারণাটি ইসলামী আকীদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলাম স্পষ্টভাবে নবীজিকে একজন মানব, রাসূল এবং আল্লাহর প্রেরিত বান্দা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তাঁর রূহ আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী অবস্থান করছে।

কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
– সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৪:
“মুহাম্মদ তো একজন রাসূল, তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তাহলে কি তিনি মারা গেলে বা নিহত হলে তোমরা ফিরে যাবে?” এই আয়াত স্পষ্টভাবে নবীজির মৃত্যুর কথা ঘোষণা করে, যা তাঁর দুনিয়াবী উপস্থিতি শেষ হওয়ার প্রমাণ।

– সূরা আনআম, আয়াত ৫০:
_“বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডার রয়েছে, আমি অদৃশ্য জানি না, আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ।”
নবীজির নিজস্ব ঘোষণা যে তিনি অদৃশ্য জানেন না এবং একজন সাধারণ মানুষ, যা সর্বত্র বিরাজমান হওয়ার ধারণার বিপরীত।

হাদীসের আলোকে
– সহীহ মুসলিম-এর একটি হাদীসে নবীজি (সা.) বলেন: “আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ, তবে আমার কাছে ওহী আসে।” এটি তাঁর মানবিক সীমাবদ্ধতা ও নবুয়তের প্রকৃতি বোঝায়।

– মিরাজের হাদীস:
নবীজি (সা.) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আসমানে গমন করেন। যদি তিনি সর্বত্র বিরাজমান হতেন, তবে এ গমন ও সাক্ষাতের প্রয়োজন হতো না।

ইসলামি আকীদা অনুযায়ী
– নবীজি (সা.)-এর রূহ সম্মানিত, কিন্তু তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন।
– আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত মতে, নবীজি (সা.)-এর রূহ বারযাখে অবস্থান করছে, এবং তাঁর উম্মতের সালাম পৌঁছে যায়—তবে তা আল্লাহর ব্যবস্থায়, তাঁর সর্বত্র উপস্থিতির কারণে নয়।

ভুল ধারণা সম্পর্কে সতর্কতা
“নবীজি সর্বত্র বিরাজমান” বলা হলে তা প্যানথেইজম বা আল্লাহর সত্তার সঙ্গে নবীজিকে এক করে ফেলার মতো ভুল আকীদায় পরিণত হতে পারে, যা ইসলাম স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

এবার চলুন এমন কিছু কোরআন ও সহীহ হাদীসের দলিল দেখি, যেগুলো আগে উল্লেখ করা হয়নি এবং যেগুলো নবীজি (সা.)-এর সর্বত্র বিরাজমানতার ধারণাকে খণ্ডন করে ইসলামী আকীদার ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে।

অতিরিক্ত কোরআনিক দলিল

সূরা ফাতির, আয়াত ২২ “তুমি মৃতদেরকে শুনাতে পারবে না, আর যারা কবরস্থ—তাদেরকেও শুনাতে পারবে না।”
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মৃত্যুর পর নবীজিসহ সকল মানুষ দুনিয়ার শ্রবণ ও উপস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন। সর্বত্র বিরাজমান হলে এই শ্রবণ-অক্ষমতা থাকত না।

সূরা যুমার, আয়াত ৩০
“নিশ্চয়ই তুমি (হে নবী) মৃত্যুবরণ করবে এবং তারাও মৃত্যুবরণ করবে।”
এটি নবীজির মৃত্যুর স্পষ্ট ঘোষণা, যা তাঁর দুনিয়াবী উপস্থিতির অবসান নির্দেশ করে।

অতিরিক্ত হাদীস দলিল

– সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৪১
উমর (রা.) বলেন, “যে ব্যক্তি বলবে মুহাম্মদ (সা.) মারা যাননি, আমি তাকে হত্যা করব।”

সাহাবীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল নবীজি মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন।

– সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৭৪
_নবীজি (সা.) বলেন, “আমি তোমাদের মধ্যে একজন মানুষ, আমার মৃত্যু হবে যেমন তোমাদের হয়।”
এটি তাঁর মানবিক সীমাবদ্ধতা ও মৃত্যুর বাস্তবতা তুলে ধরে।

আকীদা ও সালাফদের বক্তব্য

– ইমাম আবু হানিফা (রহ.) : “যে বলবে, আমি জানি না, আল্লাহ আসমানে না জমিনে—সে কাফির।”
এই বক্তব্য নবী বা আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমানতার ধারণাকে সরাসরি খণ্ডন করে।

-ইমাম মালিক (রহ.) “ইস্তিওয়ার অর্থ জানা, কিন্তু কিভাবে তা হয়েছে তা অজানা। প্রশ্ন করা বিদআত।”
আল্লাহর আরশে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন নিষিদ্ধ, নবীজির সর্বত্র উপস্থিতির ধারণা তো আরও দূরবর্তী।

ভুল ধারণার বিপরীতে সতর্কতা

– “হাজির-নাজির” আকীদা
➤ কিছু গোষ্ঠী নবীজিকে সর্বত্র হাজির-নাজির মনে করে, যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত-এর মূল আকীদার পরিপন্থী।
➤ এটি ওহাবী, মুতাযিলা বা জাহমিয়্যাহ ফিরকার ভ্রান্ত চিন্তার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

নবীজি (সা.) সর্বত্র বিরাজমান—এই ধারণা যারা পোষণ করেন, তাদের কিছু সাধারণ যুক্তি রয়েছে, যদিও তা ইসলামী আকীদার মূলধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিচে তাদের ব্যবহৃত যুক্তিগুলোর একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরছি, যাতে সবাই বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেন:

যারা “নবীজি সর্বত্র বিরাজমান” বলেন, তাদের সাধারণ যুক্তিগুলো

এক. “হাজির-নাজির” আকীদা
– তারা বলেন, নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতের সব কাজ দেখেন এবং শুনতে পান।
– এই ধারণা মূলত ইলমে গায়েব বা অদৃশ্য জ্ঞানকে নবীজির জন্য প্রযোজ্য করে তোলে, যা কোরআন ও হাদীস অনুযায়ী শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত।

দুই. নবীজির রূহ সর্বত্র উপস্থিত
– কিছু গোষ্ঠী বিশ্বাস করে, নবীজির রূহ বারযাখে নয়, বরং দুনিয়ার প্রতিটি স্থানে উপস্থিত।
– তারা বলেন, তাঁর রূহ এত সম্মানিত যে তা সীমাহীনভাবে বিস্তৃত হতে পারে।

তিন. সালাম পৌঁছানোর ধারণা
– তারা যুক্তি দেন, যেহেতু নবীজি (সা.)-কে সালাম পাঠালে তা পৌঁছে যায়, তাই তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
– অথচ সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে, ফেরেশতারা সালাম নবীজির কাছে পৌঁছে দেন—এটি তাঁর সর্বত্র উপস্থিতির প্রমাণ নয়।

চার. আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার মতো নবীজিও নিকটবর্তী
– তারা বলেন, যেমন আল্লাহ “শাহ রগের চেয়েও নিকট” (সূরা ক্বাফ: ১৬), তেমনি নবীজিও তাঁর উম্মতের অন্তরে বিরাজ করেন।
– এই তুলনা আল্লাহর গুণাবলিকে নবীজির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা, যা ইসলামী আকীদায় শিরক বা গোমরাহির আশঙ্কা তৈরি করে।

পাঁচ. কিছু সুফি দর্শনের প্রভাব
– সুফিবাদে “ওহদাতুল ওয়ুজুদ” বা “সত্তার ঐক্য” মতবাদে বিশ্বাসীরা নবীজিকে আল্লাহর নূর বা সত্তার অংশ হিসেবে দেখেন।
– তারা বলেন, নবীজি আল্লাহর নূর, তাই তিনি সর্বত্র বিরাজমান হতে পারেন।

ইসলামী মূলধারার প্রতিক্রিয়া

– আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত স্পষ্টভাবে বলে, নবীজি (সা.) একজন মানব, রাসূল এবং তাঁর রূহ বারযাখে অবস্থান করছে।
– তাঁর সালাম গ্রহণ, উম্মতের প্রতি দো‘আ, সবই আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় হয়, নবীজির সর্বত্র উপস্থিতির কারণে নয়।

“হাজির-নাজির” আকীদা এটি জাহমিয়্যাহ, মুতাযিলা ও সুফি চরমপন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ, যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার পরিপন্থী।

সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy