

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল কখনোই নিছক প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তাগত ভূমিকম্প। শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনকাল শেষে যখন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন অনেকেই আশাবাদী ছিলেন—নতুন নেতৃত্ব হয়তো গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। কিন্তু বাস্তবতা যেন উল্টো চিত্র আঁকে। ডাকাতি, লুটতরাজ, হত্যা, সাংবাদিক নিধন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে: কেন এই উল্লম্ফন? এর পেছনে কি শুধুই প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি রয়েছে গভীরতর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ?
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক কাঠামোতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা অনেকাংশে অপরাধ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। দীর্ঘদিনের একটি সরকার যখন বিদায় নেয়, তখন তার অনুগত প্রশাসনিক কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। নতুন সরকার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে সময় নেয়, আর সেই সময়টুকু অপরাধীরা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে।

– পুলিশ প্রশাসনের দ্বিধা: নতুন রাজনৈতিক নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে অপরাধ দমন থেকে বিরত থাকেন।
– স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: পুরনো ও নতুন রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, প্রতিশোধমূলক হামলা ও এলাকা দখলের প্রতিযোগিতা বাড়ে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা নতুন নয়। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অনেক সময় দেখা যায়, নতুন সরকার পুরনো দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, এমনকি নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। এর ফলে:
– আইনের অপব্যবহার হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা সৃষ্টি করে।
– অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়, ফলে অপরাধ দমন কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া, রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে অনেক সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়, যারা সত্য প্রকাশে সাহস দেখায়। এটি শুধু গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলে না, বরং সমাজে একটি ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
শাসন পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন, বিনিয়োগে স্থবিরতা, এবং বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর ফলে:
– বেকারত্ব বাড়ে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।
– অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ে, কারণ জীবিকা নির্বাহের বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক হতাশা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আইনের শিথিল প্রয়োগও দায়ী।
শাসন পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি সংকুচিত হয়, তাহলে অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে বাধা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিক হত্যা বা নিপীড়ন শুধু একটি পেশার ওপর আঘাত নয়, এটি সত্যের ওপর আঘাত।
– নাগরিক সমাজের নীরবতা অপরাধীদের সাহস যোগায়।
– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অপরাধ বৃদ্ধির এই প্রবণতা রোধ করতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ। কিছু প্রস্তাব:
1. নিরপেক্ষ প্রশাসনিক পুনর্গঠন: দলীয় প্রভাবমুক্ত পুলিশ ও প্রশাসন গঠন করতে হবে।
2. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
3. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও তথ্য প্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে হবে।
4. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল, কলেজ, মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে।
5. নাগরিক সমাজকে সক্রিয় করা: প্রতিবাদ, পর্যবেক্ষণ ও জনমত গঠনে নাগরিকদের ভূমিকা বাড়াতে হবে।
ক্ষমতা পরিবর্তন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, কিন্তু তা যদি অপরাধের উল্লম্ফনের সূচনা হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠে—আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্রের পথে আছি? শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে অপরাধের ঢেউ উঠেছে, তা কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি সমাজের গভীরতর অসুস্থতার প্রতিফলন। এই অসুস্থতা নিরাময় করতে হলে আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা, সাহস, এবং সম্মিলিত প্রয়াস।
রোববার, ১০ আগস্ট ২০২৫, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
রোববার, ১০ আগস্ট ২০২৫
২৬ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ







