অভিমানের আড়ালে ভালোবাসা : ক্ষুদীরাম দাস

নদীর তীরে ছোট একটি শহর, নাম শান্তিপুর। এই শহরেই আকাশ আর রূপার জীবন রহঃবৎঃরিহবফ, যেন একই স্রোতে চলা দুটো নৌকা। তাদের ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে কারো সন্দেহ ছিল না, কিন্তু সেই ভালোবাসার পথ ছিল কাঁটা বিছানোÑভীষণ ঝগড়া আর সীমাহীন অভিমানের কাঁটা।

আকাশ ছিল কিছুটা রাশভারী আর বাস্তববাদী; রূপা ছিল স্বপ্নিল, আবেগপ্রবণ। স্বভাবের এই দুই মেরুর ভিন্নতাই তাদের ভালোবাসাকে যেমন আকর্ষণীয় করে তুলেছিল, তেমনই জন্ম দিত নিত্যনতুন দ্ব›েদ্বর। ঝগড়া তাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিল। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়েও শুরু হতো তুমুল কথা-কাটাকাটি, যা শেষ হতো রূপার নীরব অভিমান আর আকাশের অসহায় রাগে।

আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। দুপুর বেলা। আকাশ তার অফিসের একটা জরুরি ফাইল নিয়ে ব্যস্ত ছিল। রূপা এসে ধরল নতুন একটা প্ল্যানÑশহরে একটা ছোট ক্যাফে খুলবে তারা। আকাশ, স্বভাবতই, প্রথমে খরচ আর ঝক্কির দিকটা দেখল। “রূপা, এখন না। প্ল্যানটা ভালো, কিন্তু এত টাকা এখন কোত্থেকে আসবে? আগে একটু সেভিংস হোক,” শান্তভাবে বলতে চাইল আকাশ।

রূপা সেটাকে দেখল তার স্বপ্নকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে। “তোমার কাছে আমার কোনো ইচ্ছারই দাম নেই, আকাশ! সবসময় শুধু হিসেব, হিসেব! আমি কি বুঝি না হিসেব? তুমি আসলে চাও না আমি নিজের পায়ে দাঁড়াই!”

রূপার কথায় সামান্যতম অবিচার দেখলেও আকাশের রাগ চড়ে গেল। “আমি চাই না তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াও? এই কথা বলার আগে একবার ভাবলে? আমি দিনরাত পরিশ্রম করি কার জন্য? শুধু তোমার সুখের জন্য! আর তুমি বলছ…”

কথা শেষ না করেই রূপা চোখ মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার দ্রæত চলে যাওয়ার শব্দ আর আকাশের হতাশ দীর্ঘশ্বাসÑএটাই ছিল তাদের ঝগড়ার চিরন্তন সমাপ্তি।

রূপা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। রাগ, কষ্ট আর এক ধরনের পরাজিত অনুভ‚তি তাকে গ্রাস করল। সে জানে আকাশ তাকে ভালোবাসে, কিন্তু কেন সে বুঝতে পারে না তার ভেতরের তীব্র আকাক্সক্ষাগুলো? রূপা ঠিক করে নিল, আজ আর সে সহজে দরজা খুলবে না। আজ সে সত্যিই দূরে চলে যাবে আকাশের জগৎ থেকেÑঅন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য।

এদিকে, আকাশ নিজের কাজে মন দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। ফাইলটা হাতে, কিন্তু চোখ দুটো বারবার চলে যাচ্ছিল বন্ধ দরজার দিকে। ভালোবাসা আর আবেগ চাপা দেওয়ার আড়ালে তার একটা বিশাল অহংকার কাজ করত। সে কোনোভাবেই প্রথম গিয়ে ভুল স্বীকার করতে রাজি হতো নাÑযদিও ভেতরে ভেতরে তার শতবার মনে হতো, “যাই, একবার গিয়ে সরি বলি।” কিন্তু তার পুরুষালি জেদ তাকে আটকে রাখত।

আকাশের মনে পড়ল কয়েক মাস আগের একটা ঘটনা। রূপার জন্মদিন ছিল। আকাশ একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছিল, কিন্তু সেদিনও সকালে তাদের ঝগড়া হয়েছিল রূপার দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা নিয়ে। ঝগড়ার পর রূপা সারাদিন চুপ ছিল। আকাশ অভিমান করে উপহারটাও লুকিয়ে রেখেছিল। সন্ধ্যায় যখন রূপা অন্যমনস্ক হয়ে চা বানাচ্ছিল, তখন আকাশ দেখল, রূপার চোখের কোণে জল। সেই দিন রাতে তারা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেনি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আকাশ দেখে রূপা তার দিকে পিঠ করে শুয়ে আছে। হঠাৎ আকাশ অনুভব করল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস যেন রূপার নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে। সেই নীরবতার মাঝেই আকাশ উঠে রূপাকে জড়িয়ে ধরেছিল। একটা কথাও বলেনি তারা, কিন্তু সেই আলিঙ্গনই ছিল হাজারো ‘সরি’র চেয়েও বেশি আন্তরিক। সেই রাতে, ঝগড়ার পরেও, তারা একে অপরের নিরাপত্তা আর অস্তিত্ব অনুভব করেছিল।

আজও তেমন কিছু হলো। সময় গড়িয়ে চলল। বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা নামল। ঝগড়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেছে। আকাশ দেখল, তার অফিসের ফাইলটা আর এগোনো যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, তার মস্তিষ্কের অর্ধেকটা ওই বন্ধ দরজার পেছনে রূপার কাছে জমা আছে।

“রূপা কি খেলো? না খেয়ে থাকলে ওর শরীর খারাপ করবে,” আকাশের মনে উদ্বেগ শুরু হলো।

বাইরে হয়তো রূপা এখন স্থির নয়, হয়তো সে কাঁদছে, বালিশে মুখ গুঁজে। কিন্তু আকাশ জানে, এই সব কিছুর পরও, রূপা শেষ পর্যন্ত তার খোঁজ নেবেই। সে জানে, এই অভিমানটা হল এক ধরনের পরীক্ষার মতো, যেখানে রূপা দেখতে চায় আকাশ তাকে কতটা মিস করছে।

এই ভাবনাতেই আকাশের মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। সে জানে, রূপা তাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার ভালোবাসা প্রকাশের ধরনটা হল ঝগড়া আর অভিমানের মাধ্যমে। এই ঝগড়াগুলো তাদের ভালোবাসার প্রমাণ, যা প্রতিটি ভুল বোঝাবুঝির পর সম্পর্ককে আরও মজবুত করে।

রাত তখন আটটা। আকাশ আর থাকতে পারল না। এবার সে যাবে। জেদ আর অহংকারকে আলমারিতে তুলে রেখে সে দরজার দিকে পা বাড়াল।

ঠিক তখনই দরজায় একটা হালকা টোকা পড়ল।

আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। রূপা!

ধীরে ধীরে দরজা খুলল আকাশ। দেখল, রূপা দাঁড়িয়ে আছেÑচোখ দুটো সামান্য ফোলা, কিন্তু মুখে একটা দুর্বল হাসি। রূপার হাতে এক মগ আদা চা আর একটা প্লেটে বিস্কুট।

রূপা ফিসফিস করে বলল, “সারাদিন তো কিছু খাওনি, তাই না? জানি, তুমি এখন অফিসে কাজে ব্যস্ত ছিলে। চা-টা খাও, ঠাÐা হয়ে যাচ্ছে।”

রূপা একটা কথাও বলল না তাদের ঝগড়া নিয়ে। কোনো ‘সরি’ বা ‘কেন এমন করলে’ জিজ্ঞাসা করল না। শুধু নীরবে তার যতœ আর ভালোবাসাটুকু এগিয়ে দিল।

আকাশের চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটাই তার জীবনের সবথেকে বড় আশ্রয়। যে মানুষটি তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, রাগ দেখায়, অভিমান করে, সেই মানুষটিই দিন শেষে সবার আগে তার ক্ষুধা আর শান্তির খোঁজ নেয়। রূপার অভিমান হল একটা মোড়ক, যার ভেতরে মোড়ানো আছে অসীম মমতা।

আকাশ মগটা হাতে নিল না। সে মগটা একপাশে সরিয়ে রূপাকে কাছে টেনে নিল। রূপার ঠোঁটে তখনো সেই মৃদু হাসি লেগে আছে। এই হাসিটা হল তাদের সম্পর্কের বিজয়ের হাসিÑঅভিমানের ওপর ভালোবাসার বিজয়।

“আমি দুঃখিত, রূপা,” আকাশ শান্ত স্বরে বলল। “আমি তোমার স্বপ্নটাকে প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। আমরা করব ক্যাফেটা, ঠিক আছে? তুমি যেমনটা চাও।”

রূপা আকাশকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। “আমিও দুঃখিত, আকাশ। আমি জানি তুমি আমার জন্য কী না করো। তুমিই আমার সব।”

সেই রাতে, চা আর বিস্কুট হাতে পাশাপাশি বসে তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করল। তাদের ঝগড়াগুলো তখন বহু দূরে, নদীর ওপারে ভেসে যাওয়া মেঘের মতো।

আকাশ ভাবল: এই মানুষটিকে কখনো হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত না। কারণ, এই মানুষটিই একমাত্র যে ঝগড়ার তীব্র গরমেও এক ঝলক শীতল বাতাস নিয়ে আসেÑএক কাপ চা আর এক মুহূর্তের আন্তরিক খোঁজ। অভিমান তার ঢাল, আর যতœ তার তরবারি। আর আকাশ জানে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ঝগড়া আর এই খোঁজ চলতে থাকবে, আর এটাই হলো তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে খাঁটি রূপ।

রোববার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like