অন্ধকার থেকে আলোয় : ক্ষুদীরাম দাস

কলকাতা থেকে দীঘা-গামী বাসটি ছুটে চলেছে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে, রাস্তার দু’ধারে আবছা আলো-ছায়ার খেলা। বাসের মধ্য-আসনে জানালার ধারে বসে আছেন এক প্রৌঢ়, পাস্টর শমুয়েল। তাঁর শান্ত, সৌম্য মুখে এক স্বর্গীয় আভা। তিনি বাইবেলের পাতা উল্টাচ্ছিলেন, তাঁর ঠোঁট নড়ছিলো নীরবে। কিন্তু একটু পর পর যখন তিনি চোখ বুজে, হাতজোড় করে নিচু স্বরে প্রার্থনা করছিলেন, সেই স্বর বাসের অন্যান্য যাত্রীদের কানে স্পষ্ট আসছিলো।

পাশাপাশি সিটে বসেছিলো দীপা, এক যুবতী। তার চোখে ছিলো এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন জীবনের ভারে নুয়ে পড়া এক আত্মা। দীপার চঞ্চল মন আর বিক্ষিপ্ত দৃষ্টি বারবার ফিরে যাচ্ছিলো পাস্টর শমুয়েলের দিকে। তার সেই নির্লিপ্ত, শান্ত প্রার্থনা যেন এক অদৃশ্য স্রোতের মতো তার অস্থির হৃদয়ের গভীরে আঘাত হানছিলো।

যাত্রীরা বিষয়টি লক্ষ্য করছিলো। তাদের মনে কোনো কৌত‚হল ছিলো না, শুধু এক ধরণের নীরব সম্মান ছিলো। তারা বুঝতে পেরেছিলো, ইনি একজন খ্রীষ্টান, একজন পাস্টর, ঈশ্বরের কাজে নিবেদিত এক মানুষ।

পাস্টর শমুয়েল প্রার্থনা করছিলেন তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যে, পৃথিবীর শান্তি ও পরিত্রাণের জন্যে। কিন্তু তার শেষ প্রার্থনাগুলো ছিলো যেন আরো ব্যক্তিগত, আরও গভীর: “প্রভু, আমি পাপী। তবু তোমার অসীম দয়ায় তুমি আমাকে এ পরিচর্যার সুযোগ দিয়েছো। তুমি সেই সব হারিয়ে যাওয়া ভেড়ার জন্যে প্রার্থনা করি যারা পথ খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের হৃদয়ে তোমার আলো দাও, তাদের অনুশোচনা দাও, আর তাদের ক্ষমা করো। তোমার প্রেমেই তাদের মুক্তি হোক, প্রভু।”

দীপা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো তাঁর দিকে। এ প্রার্থনা, এ স্বীকারোক্তি, তার হৃদয়ের গভীরে থাকা সুপ্ত যন্ত্রণাকে জাগিয়ে তুললো। পাস্টরের প্রতিটি কথা যেন একটি ধারালো ছুরির মতো তার আত্মাকে কেটে ফেলছিলো; কিন্তু সেই কাটা স্থান থেকে রক্ত নয়, ঝরছিলো শুধু অনুতাপের অশ্রæ।

দীপার জীবন ছিলো ভুলে ভরা, একসময় সে অর্থ আর ক্ষণিকের আনন্দের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়েছিলো। এখন তার মনে শুধু অনুশোচনা আর এক দুর্বোধ্য শূন্যতা। সে জানতো, সে যা’ করেছে তা’ ক্ষমার অযোগ্য পাপ। পাস্টরের মুখ থেকে যখন সে শুনলো “আমি পাপী, তবু তোমার অসীম দয়ায়…”, তখন দীপা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।

তার ভেতরের কণ্ঠস্বর তাকে বার বার বলতে লাগলো, “এ সুযোগ! এ মুহূর্তে নিজের পাপ স্বীকার কর।” কিন্তু ভয়, লজ্জা আর জড়তা তাকে গ্রাস করছিলো। তার হাত কাঁপছিলো, গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। ইতস্তত করতে করতে, অবশেষে সে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেললো।

পাস্টর শমুয়েল যখন তার প্রার্থনা শেষ করে চোখ খুললেন, দীপা ফিসফিস করে বললো, “শুনুন…” পাস্টর শান্ত চোখে তার দিকে তাকালেন।

দীপা আর কথা খুঁজে পেলো না, তার চোখ ভরে এলো জলে। কান্নায় তার গলা বুজে গেলো, “আমি… আমি পাপী। আমার জীবন ভুল আর অন্ধকারে ভরা। আমি আপনার প্রার্থনা শুনেছি। আমি… আমি অনুতপ্ত। আমার পরিত্রাণের জন্যে প্রার্থনা করুন। আমার পাপ যেন ক্ষমা হয়। আমি যেন মুক্তি পেতে পারি।”

অশ্রæ ঝরছিলো অনবরত, দীপার মুখমÐল জলে ভিজে যাচ্ছিলো। সে যেন তার জীবনের সমস্ত পাপের ভার নামিয়ে দিতে চাইছিলো এ একটি কথায়। তার অনুশোচনা ছিলো খাঁটি, তার কান্না ছিলো হৃদয়বিদারক।

পাস্টর শমুয়েল কোনো প্রশ্ন করলেন না, কোনো বিচার করলেন না। তার চোখে ছিলো কেবল গভীর মমতা আর এক স্বর্গীয় সহানুভ‚তি। তিনি বুঝলেন, এ আত্মাটি অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরতে চাইছে।

তিনি আলতো করে দীপার কাঁধে হাত রাখলেন। বাসের অন্য যাত্রীরাও এখন তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো, সম্পূর্ণ নীরবতা বিরাজ করছিলো। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে পাস্টর শমুয়েল বললেন, “মা, ঈশ্বর কাউকে পাপী হিসেবে ঘৃণা করেন না। তিনি পাপকে ঘৃণা করেন, কিন্তু পাপীকে ভালোবাসেন। তুমি যখন তোমার পাপ স্বীকার করেছ, অনুতাপ করেছ, তখন জেনে রেখো, ঈশ্বরের ক্ষমা তোমার জন্যে প্রস্তুত।”

তিনি পুনরায় চোখ বন্ধ করলেন, এবং দীপার হাত ধরে প্রার্থনা শুরু করলেন, এবার তাঁর কণ্ঠস্বর ছিলো আরো আবেগপূর্ণ:

“হে স্বর্গীয় পিতা, এ যুবতী কন্যা তোমার কাছে এসেছে অনুতপ্ত হৃদয়ে। তুমি তার কান্না দেখেছো, তার পাপের স্বীকারোক্তি শুনেছো। তোমার বাক্য বলে, ‘যদি আমরা আমাদের পাপ স্বীকার করি, তবে তিনি বিশ্বস্ত ও ধার্মিক, যেন তিনি আমাদের পাপ ক্ষমা করেন ও সমস্ত অধার্মিকতা থেকে আমাদের শুচি করেন।’ প্রভু, তোমার সেই প্রতিজ্ঞা অনুসারে, যীশু খ্রীষ্টের রক্তের মাধ্যমে তুমি তার সমস্ত পাপ ক্ষমা করো। তার হৃদয়কে পবিত্র করো, তার আত্মাকে নতুন করো। তাকে মুক্তি দাও, শান্তি দাও, এবং তোমার প্রেমের পথে চালিত করো। তাকে তোমার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করো। তার জীবনকে তুমি তোমার মহিমার জন্যে ব্যবহার করো। আমেন।”

দীপা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, এবার এ কান্না ভয়ের নয়, মুক্তি ও শান্তির। সে অনুভব করলো তার হৃদয়ের উপর থেকে যেন এক বিশাল পাথর সরে গেলো। সে যেন নতুন করে শ্বাস নিতে শুরু করলো।

পাস্টর শমুয়েল মৃদু হেসে বললেন, “তোমার পাপ ক্ষমা হয়েছে, মা। বিশ্বাস রাখো। এখন তুমি নতুন জীবন শুরু করতে পারো, ঈশ্বরের আলোয় চলো।” দীপা মাথা তুললো। তার চোখে এখনো জল, কিন্তু সেখানে এখন এক নতুন দীপ্তি, আশা আর পরিত্রাণের আলো। বাসের নীরব যাত্রীরাও যেন এক অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী হলো। অনুতাপ আর ক্ষমার এ গল্প যেন তাদের হৃদয়েও এক গভীর ছাপ রেখে গেলো। দীপা জানতো, তার পথচলা মাত্র শুরু হলো, আর এ নতুন পথে তার সঙ্গী স্বয়ং ঈশ্বর।

সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like