ছোটগল্প : স্মৃতির বারান্দায় নিঃসঙ্গ প্রদীপ

ক্ষুদীরাম দাস :

প্রথম অধ্যায়
সকালবেলার রোদটা জানালার শার্সি দিয়ে এসে যখন ডি কস্টা সাহেবের মুখে পড়ে, তখন চারপাশটা শান্ত আর নিস্তব্ধ মনে হয়। চার বছর আগে এ বাড়িটি এমন ছিলো না। তখন ভোরের আলো ফুটতেই সদর দরজায় মানুষের ভিড় জমতো। কলিংবেলের শব্দে আর আগন্তুকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতো পুরো আঙিনা। চার বছর আগে এ রাজকীয় আসবাবপত্র আর ঝকঝকে দেয়ালের আড়ালে জীবন ছিলো উৎসবে ভরা। ডাইনিং টেবিল থেকে ড্রয়িংরুমÑসর্বত্রই ছিলো আভিজাত্য আর প্রাণচাঞ্চল্যের ছোঁয়া। এখন সেই দামী সোফাগুলো আছে, দেয়ালে ঝোলানো দামী অয়েলিং পেইন্টিংগুলোও আছে, শুধু মানুষটা আর আগের মতো নেই। সময় যেন এ অট্টালিকার ভেতর থমকে দাঁড়িয়েছে।

জ্যাকব ডি কস্টা, এক সময়ের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবক, আজ নিজের বিছানায় শয্যাশায়ী। তার ইশারায় এক সময় শহরের বড় বড় কলকারখানা চলতো, কয়েকশ শ্রমিকের রুটিরুজির ব্যবস্থা হতো। আজ সেই মানুষটিই নিজের হাতটা পর্যন্ত তোলার ক্ষমতা হারিয়েছেন। স্ট্রোক তাকে কেড়ে নিয়েছে কথা বলার শক্তি, কেড়ে নিয়েছে হাঁটার ক্ষমতা। তবে তার চোখ দু’টি এখনো সজাগ। সেই চোখে এখনো বুদ্ধিদীপ্ত আভা খেলা করে, যা’ দেখে বোঝা যায় ভেতরে ভেতরে মানুষটা কতোটা সজাগ। তিনি সব দেখেন, ঘরের কোণে জমে থাকা ধুলো থেকে শুরু করে মানুষের মনের বদলÑসব শোনেন এবং সম্ভবত সব বুঝেন। তার পাশে বসে কপালে জলপট্টি দিচ্ছিলেন স্ত্রী মারিয়া। মারিয়ার চোখে ক্লান্তি; কিন্তু সে ক্লান্তি একটানা সেবার চেয়েও বেশি অবহেলার ক্ষত থেকে জন্মানো। যে মানুষগুলোর জন্যে জ্যাকব নিজের জীবনের সোনালী সময় ব্যয় করলেন, তাদের কাউকেই আজ এ বিপদে পাশে দেখা যাচ্ছে না।

মারিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “জানো জ্যাকব, আজ রোববার। চার্চের ঘণ্টা বাজছে। এক সময় এ দিনে আমাদের ড্রয়িংরুমটা লোকে লোকারণ্য থাকতো। রোববার মানেই ছিলো আমাদের বাড়িতে ভোজের আয়োজন। কতো বন্ধু, কতো সহকর্মী তোমার এক একটা কথার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতো। তোমার একটা পরামর্শ পাওয়ার জন্যে বড় বড় ব্যবসায়ীরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতো। আজ তোমার কোনো খোঁজ নেয়ার কেউ নেই। সেই বড় বড় অট্টালিকা গড়া বন্ধুরা আজ হয়তো গলফ খেলছে অথবা অন্য কোনো পার্টিতে মত্ত, অথচ তাদের সুসময়ের কাÐারি আজ বিছানায় পড়ে ধুঁকছে।”

মারিয়া যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন তার কণ্ঠস্বরে এক ধরণের বিষাদমাখা তিক্ততা ঝরে পড়ছিলো। তিনি টেবিলের ওপর রাখা বাইবেলটা একটু সরিয়ে রাখলেন। ঘরের ভেতরটা কর্প‚রের গন্ধে ভ্যাপসা হয়ে আছে। জ্যাকব তার চোখের মণিটা একটু ঘোরালেন। তার চোখের মণি স্থির হলো মারিয়ার মুখের ওপর। মারিয়া বুঝতে পারলেন তিনি কিছু বলতে চাইছেন। হয়তো বলতে চাইছেনÑ‘মারিয়া, কেঁদো না’, অথবা হয়তো জানতে চাইছেনÑ‘জনসন বা ফিলিপ কি ফোন করেছিলো?’ কিন্তু কথাগুলো গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে। তার ওষ্ঠাধর থরথর করে কাঁপলো ঠিকই, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। এ অক্ষমতা যে কতোটা যন্ত্রণার, তা’ কেবল জ্যাকব আর ঈশ্বর জানেন।

মারিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পর্দাটা আরো একটু টেনে দিলেন যাতে রোদের তীব্রতা সরাসরি জ্যাকবের চোখে না লাগে। তিনি করুণ স্বরে বললেন, “এটাই হয়তো জগতের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। যখন তোমার ভাÐার পূর্ণ ছিলো, তখন সবাই ছিলো মৌমাছির মতো। আজ ভাÐার শূন্য হতে চললো, আর তুমিও অচল হয়ে গেলে, তাই সবাই একে একে ডানা মেলে উড়ে গেলো। কিন্তু এ এতোটাই নিষ্ঠুর যে তা’ মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়। তোমার সাথে দিনরাত যারা থাকতো, যাদেরকে তুমি নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতে, সেই কর্মীরা আজ তোমাকে ভুলেই গেছে। তারা এখন অন্য কোনো প্রভুর দ্বারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমার এই চার বছরের অসুস্থতায় তারা একদিনের জন্যেও এ গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো না। কেউ একবার জানতে চাইলো নাÑ ‘স্যার এখনো কি বেঁচে আছেন?’ মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধ কি এতোটাই ঠুনকো জ্যাকব?”

জ্যাকবের দৃষ্টি তখন ছাদের দিকে স্থির হয়ে গেলো। তার চোখের কোণে এক বিন্দু নোনা জল জমা হয়েছে। তিনি ভাবছিলেন সেই মুখগুলোর কথা, যারা তার হাতে তৈরি। যাদের অভাবের দিনে তিনি দু’ হাত ভরে সাহায্য করেছেন। অথচ আজ তার এ দুর্দিনে সেই সব মুখগুলো কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে। মারিয়া তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। এ নিথর রাজপ্রাসাদে এখন কেবল দু’ বুড়ো-বুড়ির দীর্ঘশ্বাস আর দেয়াল ঘড়ির ‘টিক টিক’ শব্দ ছাড়া আর কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। আত্মীয়স্বজনরা মাঝেমধ্যে ফোনে খবর নেয় ঠিকই, তবে তা’ কেবল লোক দেখানো সৌজন্যতা। কেউ পাশে এসে বসার সময় পায় না। মারিয়া ভাবছিলেন, মানুষের প্রতি এতোটা বিশ্বাস রাখা কি জ্যাকবের ভুল ছিলো? নাকি এটাই এ জগতের শাশ্বত নিয়ম?

দ্বিতীয় অধ্যায়
বিকেলের আকাশটা তখন হালকা রক্তিম আভা ধারণ করেছে। সেন্ট জোসেফ গীর্জার ঘণ্টা বাজার রেশ তখনো বাতাসে ভাসছে। ঠিক সেই সময়ে গেটে রিকশার শব্দ শোনা গেলো। সেন্ট জোসেফ গীর্জার ফাদার পিউস দেখা করতে আসলেন। ডি কস্টা পরিবার বংশপরম্পরায় এই গীর্জার বড় দাতা ছিলো। গীর্জার মেরামতি থেকে শুরু করে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাÑসব কিছুতেই জ্যাকবের অনুদান ছিলো অবারিত। ফাদার আসাতে মারিয়া কিছুটা সান্ত¡না পেলেন। এ দীর্ঘ চার বছরের একাকী জীবনে ফাদার পিউস ছাড়া আর কেউই তেমন নিয়ম করে খোঁজ নিতে আসেন না। মারিয়া তাকে পরম আদরে ভেতরে নিয়ে আসলেন। বাইরের বারান্দায় বিকেলের ¤øান আলো এসে পড়েছে, আর চারপাশটা এক অদ্ভুত বিষণœতায় ছেয়ে আছে।
ড্রয়িংরুমে বসে কফি খেতে খেতে মারিয়া বলছিলেন তার মনের জমানো যাতনা। ড্রয়িংরুমের দেয়ালের দিকে তাকালে এখনো দেখা যায় বড় বড় ফ্রেমে বাঁধানো ছবিÑ যেখানে জ্যাকব সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। মারিয়া কফির মগে চুমুক দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তিনি বললেন, “ফাদার, এই ঘরটা এক সময় হাসাহাসি আর তর্কে মুখর থাকতো। আজ এ দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো ছাড়া আমাদের আর কোনো সঙ্গী নেই। জ্যাকবের আত্মীয়স্বজনরা তো এখন এ পথ দিয়েও হাঁটে না। আপনি তো জানেন ফাদার, ওর ছোট ভাই থমাসকে ও কতোটা ভালোবাসতো। নিজের সন্তানের মতো করে তাকে মানুষ করলো, বিদেশে পাঠিয়ে পড়াশোনা করালো, আজ সে শহরেই থাকে। অথচ সেই ভাইটি গত দু’ বছরে একবারের জন্যেও খবর নিলো না। সে হয়তো ভুলেই গেছে যে তার বড় ভাই এখনো এ পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। টাকার যখন দরকার ছিলো, তখন তারা এ বাড়িতেই পড়ে থাকতো। দিন নেই, রাত নেইÑ আবদার আর সমস্যার ডালি নিয়ে তারা জ্যাকবের সামনে বসে থাকতো। আজ জ্যাকব নিঃস্ব নয়, কিন্তু সে আজ অচল, তাই তাদের আর কোনো প্রয়োজন নেই।”

ফাদার পিউস শান্ত কণ্ঠে বললেন, “ধৈর্য ধরো মারিয়া। মানুষের স্বভাব খুব বিচিত্র এবং মাঝে মাঝে তা’ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সুসময়ে অনেকেই ছায়ার মতো পাশে থাকে, কিন্তু দুঃসময়ে নিজের ছায়াও যেন শরীর থেকে দূরে সরে যেতে চায়। পৃথিবীর এটাই রীতি। আমরা যখন যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার কথা ভাবি, তখন দেখি তার অতি আপনজনরাও তাকে ছেড়ে পালিয়েছিলো। প্রভু যীশুও কি কম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন? মানুষের এ অকৃতজ্ঞতা কোনো নতুন বিষয় নয় মারিয়া। তুমি শুধু প্রার্থনা করো, যেন জ্যাকবের মনে শান্তি থাকে।”

মারিয়া আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে বললেন, “আমি কি শুধু টাকার অভাবের কথা বলছি ফাদার? না। আমরা এখনো কোনোমতে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি। জ্যাকব তার সুসময়ে এতোটাই সঞ্চয় করেছিলো যে আমাদের অন্ন-বস্ত্রের অভাব হবে না। কিন্তু যে মানুষটার চারপাশে প্রতিদিন কয়েকশ মানুষ মৌমাছির মতো ঘুরঘুর করতো, তার এ নিদারুণ নিঃসঙ্গতা আমি সইতে পারি না। একাকীত্ব যে মানুষকে কতোটা কুরে কুরে খায়, তা’ আমি প্রতিদিন ওর চোখে দেখি। ওর সেই সব বিশ্বস্ত কর্মীরা যারা ওর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতো, যারা প্রতিদিন সকালে ‘স্যার’ ‘স্যার’ বলে মুখে ফেনা তুলতো, যারা ওর দয়ায় আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দামি গাড়িতে ঘোরে, তারা একবার এসে অন্তত জিজ্ঞাসা করতে পারতোÑ ‘স্যার, আপনি কেমন আছেন?’ তারা কি এতোটাই ব্যস্ত হয়ে গেলো? নাকি তারা ভয় পায় যে এখানে আসলে বুঝি অসুস্থতার বিষাদ তাদের গায়ে লেগে যাবে?”

মারিয়ার কথাগুলো পাশের ঘর থেকে জ্যাকব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। তার কানের পর্দাগুলো এখনো খুব প্রখর। প্রতিটি শব্দ তীরের মতো তার বুকে বিঁধছিলো। তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়লো। তিনি শব্দ করে কাঁদতে পারছেন না, আর্তনাদ করে কাউকে ডাকতে পারছেন না, কেবল তার চোখের কোণটা অবিরত ভিজে উঠছে। তার স্মৃতিতে ভেসে আসছিলো চার বছর আগের সেই রাতটির কথা। অসুস্থ হওয়ার ঠিক আগের রাতেও তিনি এক বিশাল চ্যারিটি ডিনারের আয়োজন করেছিলেন। কয়েকশ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা তিনি নিজ হাতে তদারকি করেছিলেন। সেদিন যারা তার প্লেটে খাবার তুলে দিয়েছিলোর, আজ তারা কেউ তার শিয়রে এক চামচ জল নিয়ে আসার জন্যেও উপস্থিত নেই।

তিনি মনে মনে ভাবছিলেন সেই সব ছোট ভাই-বোনদের কথা, যাদের বিয়ের খরচ থেকে শুরু করে বাড়ি তৈরির টাকা পর্যন্ত তিনি হাসি মুখে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজ তারা হয়তো তাদের সুন্দর ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছে, কিন্তু এ বাড়িতে যে তাদের বড় ভাইটি চার বছর ধরে শয্যাশায়ী, সেই খবর রাখার মতো সময় তাদের নেই। ফাদার পিউসের কণ্ঠস্বর ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছিলো। ফাদার বাইবেল থেকে পাঠ করছিলেনÑ“ধন্য তারা, যারা বিপদে ধৈর্য ধারণ করে।” জ্যাকব চোখ বন্ধ করলেন। তার মনে হলো, মানুষের ভালোবাসা আসলে এক ধরণের অভিনয়, যা’ কেবল ক্ষমতা আর প্রাচুর্য থাকলেই মঞ্চস্থ হয়। অন্ধকার এ ঘরে তিনি একা নন, তার সাথে আছে চার বছরের দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা আর এক বুক হাহাকার। মারিয়া যখন ফাদারকে বিদায় দিয়ে ঘরে ঢুকলেন, তখন দেখলেন জ্যাকব স্থির হয়ে আছেন। শুধু তার গাল বেয়ে নেমে আসা জলের ধারাটি এখনো শুকায়নি। মারিয়া আলতো করে তার কপালটা মুছে দিলেন। এই স্পর্শটুকুই এখন জ্যাকবের জীবনের একমাত্র সম্বল।

তৃতীয় অধ্যায়
শহরের রাস্তাগুলোতে তখন সন্ধ্যার ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো একটা একটা করে জ্বলে উঠছে। জ্যাকব সাহেবের এই সুবিশাল বাড়ির সামনে দিয়ে কতো মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করে; কিন্তু কারো নজর এ বাড়ির জানালার দিকে যায় না। একদিন বিকেলের ঘটনা। মারিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন, পরিচিত একজন মানুষ ফুটপাত দিয়ে হনহনিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মানুষটি আর কেউ নয়, জ্যাকবের এক সময়ের ডান হাত হিসেবে পরিচিত জনসন। এ জনসন এক সময় জ্যাকব সাহেবের অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত হয়েছিলো। জ্যাকবের ব্যক্তিগত অনেক কাজই সে সামলাতো। মারিয়া তাকে দেখতে পেয়ে বারান্দা থেকে একটু জোরেই ডাকলেন, “জনসন! ও জনসন! একটু শুনে যাও।”

জনসন ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালো। তার পরনে দামী স্যুট, হাতে দামী ঘড়ি। সে যেন খুব বিরক্তির সাথে মুখ তুলে দোতলার বারান্দার দিকে তাকালো। সে একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলো পরিচিত কেউ তাকে দেখছে কী না। এরপর খুব অনিচ্ছার সাথে সে বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে আসলো। তার হাঁটাচলার ঢং পাল্টে গেছে। ড্রয়িংরুমে যখন সে প্রবেশ করলো, মারিয়া দেখলেন তার চোখেমুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব। এক সময় যে ড্রয়িংরুমে সে মাথা নিচু করে ঢুকতো, আজ সেখানে সে সোফায় হেলান দিয়ে বসলো। মারিয়া বুঝতে পারলেন, জনসনের কাছে এ বাড়িতে আসা মানে সময় নষ্ট করা। সে বারবার তার দামী রলেক্স ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিলো।

মারিয়া শান্ত গলায় বললেন, “জনসন, কতদিন পর তোমাকে দেখলাম। তোমার স্যার ভেতরে আছেন। একটু দেখে যাবে না? উনি তোমাকে দেখলে হয়তো খুব খুশি হতেন। তোমাকে তো উনি ছেলের মতো দেখতেন।”

জনসন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু অবজ্ঞার সুরে বললো, “ম্যাডাম, আজ খুব তাড়াহুড়ো আছে। আসলে অফিসের অনেক কাজ বাকি। নতুন একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি তো, দম ফেলার সময় নেই। তাছাড়া স্যার তো কথা বলতে পারেন না, নড়াচড়া করতে পারেন নাÑউনাকে দেখে এখন আর কী করবো? দেখলে উল্টো নিজেরও মনটা খারাপ হয়ে যায়। উনার জন্য আমি চার্চে ক্যান্ডেল জ্বলাই, প্রার্থনা করি, এটাই বড় কথা। আমাদের মতো ব্যস্ত মানুষের পক্ষে তো আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা সম্ভব নয়।”

মারিয়া স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার কানে জনসনের কথাগুলো সীসার মতো ভারী হয়ে বাজছিলো। এ জনসনকে জ্যাকব নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ব্যবসার মূলধন দিয়েছিলো যখন সে পথে বসার উপক্রম হয়েছিলো। জনসনের বোনের বিয়ের সময় জ্যাকব সাহেব সব খরচ বহন করেছিলেন। আজ জনসন এতোটাই বড় হয়ে গেছে যে, পাঁচ মিনিটের জন্যে বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটাকে দেখার সময় তার নেই। জনসনের চোখে আজ কৃতজ্ঞতার লেশমাত্র নেই, বরং আছে এক ধরণের পলায়নপর মনোবৃত্তি। সে চায় না তার এ জৌলুসময় বর্তমানের সাথে জ্যাকব সাহেবের এ জরাজীর্ণ অতীতের কোনো সংযোগ থাকুক।

জনসন উঠে দাঁড়িয়ে বললো, “ম্যাডাম, আমি তাহলে আসি। একটা ইমারজেন্সি মিটিং আছে। স্যারকে আমার কথা বলবেন।” সে দ্রæতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো, যেন কোনো অভিশপ্ত জায়গা থেকে সে মুক্তি পেলো।

জনসন চলে যাওয়ার পর মারিয়া দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মনে হলো এ দেয়ালগুলো যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে জ্যাকবের ঘরে গেলেন। জ্যাকব তার বিছানায় শুয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দরজার শব্দ হতেই তিনি চোখের মণি ঘোরালেন। তার চোখে এক ধরণের প্রত্যাশা ছিলো। তিনি হয়তো জনসনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন। মারিয়া তার পাশে বসলেন। জ্যাকবের ফ্যাকাসে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তিনি জানতেন সত্যিটা বললে জ্যাকবের হৃদয় ভেঙে যাবে। তাই তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে মিথ্যে করে বললেন, “জানো জ্যাকব, জনসন এসেছিলো গো। ছেলেটা বড় ভালো। তোমাকে দেখে ওর চোখে জল চলে আসলো। খুব কান্নাকাটি করলো তোমার জন্য। ওর আজ একটা বিশেষ কাজ ছিলো, তাই থাকতে পারলো না। যাওয়ার সময় বারবার বলে গেলো তোমার যেন ঠিকমতো যতœ নেই।”

জ্যাকব তার স্ত্রীর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকাচ্ছিলেন। তিনি দীর্ঘ বছর মানুষের সাথে কারবার করেছেন, তিনি জানেন মানুষের চোখের ভাষা কী। তিনি বুঝতে পারলেন মারিয়া মিথ্যে বলছে। মারিয়ার চোখের কোণে যে জল চিকচিক করছে, তা’ জনসনের কান্নার জন্য নয়, বরং তার অকৃতজ্ঞতার আঘাতে জন্মানো। জ্যাকব বুঝতে পারলেন কেউ তাকে দেখতে আসেনি। মানুষের এই রূপ তিনি এখন খুব ভালো বুঝতে পারেন। এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো। তিনি চাইলে চিৎকার করে বলতে পারতেনÑ‘কেনো মিথ্যে সান্ত¡না দিচ্ছো মারিয়া?’ কিন্তু তার সেই ক্ষমতা নেই।

তিনি মনে মনে ভাবছিলেন সেই দিনগুলোর কথা, যখন এ জনসন তার পায়ের কাছে বসে থাকতো উপদেশের জন্যে। আজ সেই উপদেশের মূল্য জনসনের কাছে এক পয়সাও নেই। জগতের নিয়ম কতোটা দ্রæত বদলে যায়! মানুষ যখন শক্তিতে থাকে, তখন পৃথিবী তার চরণে লুটিয়ে পড়ে। আর মানুষ যখন অচল হয়ে যায়, তখন সেই পৃথিবীই তাকে জঞ্জালের মতো ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেয়। জ্যাকব চোখ বন্ধ করলেন। তিনি আর জনসনের কথা ভাবতে চান না। এ অন্ধকার ঘরের নিস্তব্ধতা এখন তার সবচেয়ে বড় বন্ধু। মারিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, আর জ্যাকব ভাবছিলেনÑ মানুষের এ অভিনয় কি মৃত্যু পর্যন্তই চলতে থাকে? নাকি মৃত্যুর পর কবরেও তারা অকৃতজ্ঞতার পাথর ছুঁড়ে মারে?

চতুর্থ অধ্যায়
দিন যত যাচ্ছিলো, অবহেলার মাত্রা ততো বাড়ছিলো। শীতের আমেজ নিয়ে বড়দিন ঘনিয়ে আসছে। এক সময় এই বাড়িতে বড়দিনের প্রস্তুতি শুরু হতো একমাস আগে থেকে। পুরো বাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল করতো, আর ইঁটের দেয়ালগুলোও যেন উৎসবের গানে কথা বলতো। তখন আত্মীয়স্বজনের আনাগোনায় তিল ধারণের জায়গা থাকতো না। কিন্তু আজ সেই বাড়িতে কেবল কবরের নিস্তব্ধতা। জ্যাকবের বড় বোন এলিজাবেথ আর ভাগ্নেরা শহরেই থাকে। তারা চার বছর ধরে খুব একটা এমুখো হয়নি। কিন্তু এক কনকনে শীতের বিকেলে তারা হঠাৎ সদলবলে বাড়িতে আসলো। মারিয়া ভেবেছিলেন, হয়তো বড়দিন উপলক্ষে তারা বড় মামাকে দেখতে এসেছে। কিন্তু তাদের ভাবভঙ্গি ছিলো অন্যরকম।

তারা জ্যাকবকে দেখতে নয়, বরং আসলো এক গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে। ড্রয়িংরুমে বসেই এলিজাবেথ এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। তার চোখ যেন দেয়ালে ঝোলানো ঝাড়বাতি আর দামী আসবাবপত্রের দাম মাপছিল। মারিয়া তাদের জন্য চা আর কেক নিয়ে আসলেন। তিনি ¤øান হেসে বললেন, “তোমরা এসেছো খুব ভালো লাগলো। তোমাদের মামা ইদানীং খুব একা বোধ করেন। তোমাদের দেখার জন্য হয়তো মনে মনে তিনি ছটফট করেন। একটু ভেতরে গিয়ে উনার সাথে বসবে না?”

জ্যাকবের বড় ভাগ্নে বিনয়, যে এক সময় মামার টাকায় ব্যবসা শুরু করেছিলো, সে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খুব শীতল গলায় বললো, “মামি, মামা তো আর ভালো হবেন না। ডাক্তার কী বললো? এতো বছর তো হয়ে গেলো। আসলে এই এতো বড় বাড়িটা তো এখন ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। আমরা ভাবছিলাম, এতো বড় প্রপার্টি এভাবে ফেলে রাখা ঠিক নয়। মামা কি কোনো উইল বা সম্পত্তির দলিল করে গেছেন? যদি কোনো উইল না থাকে, তবে তো পরে আমাদের সবার জন্যে মুশকিল হবে। আইনি জটিলতায় পড়লে তো বিপদের শেষ থাকবে না।”

মারিয়া স্তম্ভিত হয়ে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে মামার হাত ধরে সে ব্যবসা শিখলো, সেই মামার মৃত্যুচিন্তা তাকে এতোটা গ্রাস করেছে যে, সে বেঁচে থাকা অবস্থায় সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা করছে! মারিয়া বিষণœ হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন এ মানুষগুলো কতোটা নিচে নামতে পারে। রক্তের সম্পর্কও যে এতোটা স্বার্থপর হতে পারে, তা’ আজ তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। মারিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “তোমাদের মামা এখনো জীবিত। তিনি সব শুনছেন। উনার শরীর অচল হতে পারে, কিন্তু বুদ্ধি এখনো প্রখর। তোমরা কি একবারও উনার শিয়রে গিয়ে বসবে না? অন্তত উনার হাতটা ধরে একটু সান্ত¡না তো দিতে পারো।”

তারা অনিচ্ছাসত্তে¡ও একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলো। শেষে খুব দ্রæত জ্যাকবের শোবার ঘরে গেলো। ঘরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো। বিছানায় শুয়ে থাকা জীর্ণ শীর্ণ জ্যাকবকে দেখে তাদের মনে কোনো মায়া জাগলো না। বিনয় জ্যাকবের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটা কৃত্রিম কথা বললোÑ“কেমন আছেন মামা? আমরা আপনার জন্যে প্রার্থনা করছি।” অথচ তার চোখে ছিলো চাতুর্য আর সম্পদের লোভ। এলিজাবেথ আলমারির চাবির দিকে তাকাচ্ছিলেন। তাদের চোখে বিন্দুমাত্র মায়া ছিলো না। তারা যেন এক নজরে দেখে নিতে চাইছিলেন, এ জরাজীর্ণ শরীরটা আর কতোদিন এ সম্পদ আগলে রাখবে।

তারা চলে যাওয়ার পর পুরো ঘরটা এক অসহ্য গন্ধে ভরে রইলোÑ সে গন্ধ স্বার্থপরতার। জ্যাকব হঠাৎ করে তার অবশ হাতটা একটু নড়ালেন। তার গলার রগগুলো ফুলে উঠলো। তিনি খুব চেষ্টা করছিলেন কিছু বলতে, হয়তো বলতে চাইছিলেনÑ ‘আমি এখনো শেষ হয়ে যাইনি’। কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু এক ধরণের অস্ফুট গোঙানির মতো শব্দ বের হলো। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিলো। মারিয়া দৌড়ে এসে তার হাতটা শক্ত করে ধরলেন এবং নিজের চোখের জল লুকিয়ে বললেন, “আমি আছি জ্যাকব। আমি সারাজীবন তোমার পাশে থাকবো। এ স্বার্থপর পৃথিবী তোমাকে ভুলে গেলেও, আমি তো আছি। আমি তোমার প্রতিটি নিশ্বাস বুঝতে পারি।”

জ্যাকব তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সে হাসিতে কতোটা বেদনা আর কতোটা কৃতজ্ঞতা ছিলো, তা’ পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র এ পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। তিনি বুঝলেন, রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় সম্পর্ক হলো আত্মার। যারা একদিন তার দয়ায় জীবন গুছিয়ে নিয়েছিলো, তারা আজ তাকে মৃত ঘোষণা করার অপেক্ষায় আছে। ঘরের দেয়াল ঘড়িটা তখনো টি-টিক করে বাজছে, যেন বলছেÑ‘সময় বদলায়, কিন্তু মানুষের লোভ কখনো কমে না’। জ্যাকব স্থির হয়ে শুয়ে রইলেন, তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইলো সেই জানালার দিকে, যেখান দিয়ে কেবল আকাশের মেঘ দেখা যায়Ñ যেখানে মানুষের মিথ্যা প্রবঞ্চনা পৌঁছাতে পারে না।

পঞ্চম অধ্যায়
বাইরে তখন ঝিরঝিরে শীতের বাতাস বইছে। বড়দিনের আগের রোববার। সারা শহর যখন আলোকসজ্জায় সেজে উঠছে, ডি কস্টা সাহেবের বিশাল বাড়িটি তখনো একাকীত্বের চাদরে ঢাকা। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ভাঙলো বিকেলে, যখন গেটের সামনে একদল শিশুর কলকাকলি শোনা গেলো। সেন্ট জোসেফ গীর্জার ফাদার পিউস একদল শিশুকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। এরা চার্চের কয়্যার গ্রæপের শিশু। ফাদার জানতেন, এই চার বছর জ্যাকব কোনো উৎসবে শামিল হতে পারেননি। তাই তিনি এ শিশুদের নিয়ে এসেছেন এক টুকরো আনন্দ বিলিয়ে দিতে। শিশুরা যখন হাসিমুখে ঘরে ঢুকলো, তখন অন্ধকার ঘরটা যেন হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

মারিয়া অবাক হয়ে দরজা খুলে দিলেন। শিশুরা রঙিন টুপি পরে আছে, তাদের হাতে ছোট ছোট মোমবাতি আর যিশুর জন্মের ছবি। মারিয়া গদগদ স্বরে বললেন, “ফাদার, আপনি এ শিশুদের নিয়ে এসেছেন! আমি তো ভাবতেই পারিনি এ জনমানবহীন বাড়িতে আবার কোনোদিন উৎসবের সুর বাজবে।” ফাদার পিউস হাসলেন, সেই হাসিতে ছিলো অসীম করুণা। তিনি বললেন, “মারিয়া, প্রভু যীশু বলেছিলেন শিশুদের তাঁর কাছে আসতে দিতে। কারণ স্বর্গরাজ্য তাদেরই মতো সরল মানুষদের জন্যে। জ্যাকব হয়তো বড় বড় মানুষদের অকৃতজ্ঞতায় কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু এ নিষ্পাপ শিশুদের ভালোবাসা তাকে শান্তি দেবে।”

শিশুরা জ্যাকবের বিছানার চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়ালো। জ্যাকব প্রথমে একটু ভড়কে গিয়েছিলেন, কিন্তু শিশুদের উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে তার চোখের মণি স্থির হলো। তারা যখন গিটার আর হারমোনিয়ামের সুরে সুরে বড়দিনের ক্যারল গাইতে শুরু করলো, তখন পুরো ঘরের গুমোট পরিবেশ এক নিমেষে বদলে গেলো। শিশুরা সমস্বরে গাইছিলো, “শান্তি আসুক এই ভুবনে, আনন্দ আসুক ঘরে ঘরে…।” তাদের কণ্ঠের সেই মাধুর্য আর অকৃত্রিম হাসি জ্যাকবের হিমশীতল হৃদয়ে এক অলৌকিক উষ্ণতা বয়ে আনলো।

জ্যাকবের চোখে তখন জলের ধারা। এ শিশুরা তাকে চেনে না। তিনি তাদের জন্যে কোনোদিন আলাদা করে কিছু করেননি। তিনি যাদের জন্যে অঢেল অর্থ ব্যয় করেছেন, যাদেরকে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানে বড় করেছেন, তারা কেউ আজ পাশে নেই। অথচ এ অচেনা শিশুরা, যাদের কাছে জ্যাকব কোনো দাতা নন বরং কেবল একজন অসুস্থ মানুষ, তারা এসে তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। মানুষের সম্পর্কের কি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ আছে? হয়তো নেই। ভালোবাসা সেখানেই বিকশিত হয়, যেখানে কোনো স্বার্থের বালাই নেই।

মারিয়া এক কোণায় দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন। তার দু’চোখ বেয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়লো। তিনি ভাবছিলেন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা কর্মীরা যা’ দিতে পারেনি, এ শিশুরা আজ তা’ অনায়াসে দিয়ে দিলো। জ্যাকবকে আজ আর অসহায় মনে হচ্ছিলো না। তিনি তার ডান হাতের একটা আঙুল সামান্য নাড়ালেন, যেন শিশুদের গানের তালে তালে নিজেও সাড়া দিতে চাইছেন। শিশুদের একজন এগিয়ে এসে জ্যাকবের হাতে একটা ছোট ক্রিসমাস কার্ড দিলো। কার্ডে আঁকা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। জ্যাকব সেই কার্ডটির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন এটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার।

রাত গভীর হলো। ফাদার আর শিশুরা চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার শান্ত হয়ে গেলো, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আর আগের মতো ভারী মনে হচ্ছিলো না। মারিয়া জ্যাকবের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “জ্যাকব, দেখলে তো? প্রভু কাউকে একা ছাড়েন না। যারা তোমাকে ভুলে গেছে, তাদের প্রতি আর কোনো ক্ষোভ রেখো না। তারা তাদের ক্ষুদ্রতা নিয়ে বেঁচে থাকুক। তুমি বরং এই শিশুদের পবিত্র হাসিটাকে মনের ভেতর গেঁথে নাও। পৃথিবীটা মাঝে মাঝে এতোটাই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি, কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা’ সব ঘৃণা মুছে দেয়।”

জ্যাকব তার স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আজ মনে মনে সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তার সেই অকৃতজ্ঞ কর্মীদের, যারা তাকে ভুলে গিয়ে অন্য প্রভুর চরণ বন্দনা করছে; সেই স্বার্থপর আত্মীয়দের, যারা তার মৃত্যুর অপেক্ষা করছে শুধু সম্পত্তির জন্য; আর সেই নামধারী বন্ধুদের, যারা সুসময়ে মৌমাছির মতো পাশে থাকতো। তিনি এখন শুধু পরম শান্তির অপেক্ষা করছেন। বাইরের আকাশে তখন মস্ত এক চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলো জানালার শার্সি ভেদ করে জ্যাকবের মুখে পড়েছে।

মারিয়া শোবার ঘরের ল্যাম্পটা হালকা করে দিলেন। তিনি জ্যাকবের হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, “ঘুমিয়ে পড়ো জ্যাকব। কাল বড়দিন। কেউ আসুক বা না আসুক, আমি তোমার পাশ থেকে কখনো নড়বো না। আমরা দু’জনে মিলে এই দুঃখের পাহাড় ডিঙিয়ে ঠিক আলোর সন্ধান পাবো।” জ্যাকব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার দু’টি চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল আজ আর ব্যথার নয়, আজ তা’ ছিলো গভীর এক প্রাপ্তিরÑ এক বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গিনীর কাছে থেকে পাওয়া পরম আশ্বাসের জল। যে রাজপ্রাসাদে এক সময় শোরগোল থাকতো, আজ সেখানে কেবল নীরব ভালোবাসার এক সুশীতল বাতাস বইছে। এটাই হয়তো জীবনের শেষ সত্যÑ সব হারাবার পরও যদি কেউ নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকে, তবে সেই একাকীত্বও আর কষ্টের থাকে না।

বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy