

ক্ষুদীরাম দাস :
জীবনের ২৫টি বসন্ত পার হয়ে গেছে নীরবের। এ দীর্ঘ সময়ে পড়ালেখা, ক্যারিয়ার আর বাস্তবতার নানা টানাপোড়েনে দিন কেটেছে ঠিকই, কিন্তু কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর অচেনা আলোড়ন তৈরি হয়নি কখনো। বন্ধু-বান্ধবদের প্রেম, বিচ্ছেদ আর অনুরাগের গল্প শুনে নীরবের কাছে সেগুলোকে একটু অতিরঞ্জিতই মনে হতো। সে ভাবতো, মানুষের রূপ বা স্বভাব ভালো লাগতেই পারে, তবে এক পলক দেখেই কারো প্রেমে পড়ে যাওয়া- এসব কেবল নাটক-সিনেমাতেই মানায়।

কিন্তু মানুষের জীবনের কিছু মুহূর্ত ব্যাকরণের সব নিয়ম বদলে দেয়। নীরবও জানতো না, বগুড়া থেকে নাটোর যাওয়ার পথে ছোট্ট একটা রেলওয়ে স্টেশন তার জীবনের সেই অচেনা মোড় হয়ে দাঁড়াবে।
সেদিন বিকেলে সান্তাহার স্টেশনে বেশ ভিড় ছিলো। উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত এই রেল জংশনে ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করাটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। নীরব স্টেশন চত্বরে এক কোনায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলো। লালচে আলোর সূর্যটা তখন পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়েছে। প্ল্যাটফর্মজুড়ে একধরণের চঞ্চলতাÑহকারদের হাঁকডাক, মাইকে ট্রেনের ঘোষণার শব্দ আর যাত্রীদের তাড়াহুড়ো।
ঠিক তখনই নীরব তাকে দেখলো।
স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে ছিলো মেয়েটি। পরনে সাধারণ নীল রঙের একটা সুতি সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ। তার চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছিলো। কিন্তু নীরবের নজর আটকে গেলো মেয়েটির চোখের দিকে। কালো ঘন পাপড়ির নিচে একজোড়া গভীর চোখ, যে চোখের মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আর বিষণ্নতা পাশাপাশি বাস করছিলো।
মেয়েটি একটা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলো আর মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলো। নীরব অপলক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। সে বুঝতে পারছিলো না, তার হৃদস্পন্দন এতোটা দ্রুত কেন চলছিলো। জীবনের ২৫ বছর পার করে আসা একটা ছেলে হঠাৎ একটা অচেনা মেয়েকে দেখে এতোটা ব্যাকুল হয়ে উঠছে কেন? এই ভালো লাগার পেছনের কারণ কী? কেন মনে হচ্ছে এ অচেনা মুখটিই তার জন্ম-জন্মান্তরের চেনা?
নীরব তার হাতের চায়ের কাপটা ফেলে দিয়ে ধীর পায়ে মেয়েটির দিকে এগোতে লাগলো। সে জানতো না কী বলবে, বা আদৌ কথা বলাটা ঠিক হবে কি না। কিন্তু মন বলছিলো, এই সুযোগটা হাতছাড়া হলে সে হয়তো সারা জীবন আফসোস করবে।
মেয়েটির কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে চোখ তুলে তাকালো।
“ইয়ে… নাটোরের ট্রেনটা কি এ প্ল্যাটফর্মেই আসবে?”Ñ নিজের ভেতরের তোলপাড় সামলে কোনোমতে প্রশ্নটা করলো নীরব।
মেয়েটি একটু মৃদু হাসলো। হালকা সেই হাসি দেখে নীরবের মনে হলো শান্ত প্ল্যাটফর্মে যেন একঝাঁক পাখি ডানা ঝাপটে উঠলো। মেয়েটি মিষ্টি গলায় বললো, “হ্যাঁ, এক নম্বর প্ল্যাটফর্মেই আসবে। তবে ট্রেনটা আজ একটু লেট করছে।”
“ওহ্, ধন্যবাদ।”Ñ নীরব পাশে খালি জায়গাটাতে বসলো।
“আপনিও কি নাটোরে যাবেন?”Ñ মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো।
“হ্যাঁ। আমি একটা অফিশিয়াল কাজে যাচ্ছি। আপনি?”
“আমি বাড়ি ফিরছি। নাটোরই আমার শহর।”Ñ মেয়েটি সহজ গলায় জানালো।
কথা শুরুর পর সময় যেন ডানা মেলে উড়তে শুরু করলো। মেয়েটির নাম নীলি। সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করছে। কথা বলতে বলতে নীরব খেয়াল করলো, নীলির প্রতিটি কথায় এক অদ্ভুত সততা আর সরলতা ফুটে উঠছে। সাধারণ কথাগুলোও তার মুখে অন্যরকম শোনাতো।
নীরব মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করছিলÑএ যে ভেতরে এত বড় একটা পরিবর্তন ঘটে গেলো, এটা কীভাবে সম্ভব? যে নীরব এতোদিন ধরে মেয়েদের এড়িয়ে চলেছে, সে আজ সান্তাহার স্টেশনের মতো একটা ভিড়ভাট্টাপূর্ণ জায়গায় এক অচেনা মেয়ের পাশে বসে তার প্রতিটা কথা শোনার জন্যে ব্যাকুল হয়ে আছে।
হঠাৎ মাইকে ঘোষণা হলো, কাক্সিক্ষত ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে। লোহার ট্র্যাকে ধাতব শব্দ তুলে বিশাল ট্রেনটা এসে থামলো। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেলো।
নীরব ভিড়ের মধ্যে নীলিকে আগলে রাখার চেষ্টা করছিলো। ট্রেনটিতে উঠে তারা ভাগ্যক্রমে মুখোমুখি দু’টি আসন পেয়ে গেলো। নীরব নীলির ভারী ব্যাগটা ওপরে তুলে রাখলো।
ট্রেন চলতে শুরু করলো। জানালার বাইরে সান্তাহার স্টেশন আস্তে আস্তে পেছনে সরে যেতে লাগলো। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে চারপাশে। ট্রেনের ভেতরের কুপি বাতির আলোয় নীলির মুখটা আরও মায়াবী লাগছিলো।
“আচ্ছা, আপনার কি স্টেশনে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে কষ্ট হচ্ছিলো?”Ñ নীরব জিজ্ঞেস করলো।
নীলি জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিলো, “একটু তো হচ্ছিলোই। তবে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাটা আর খারাপ থাকেনি।”
কথাটার ভেতরের গভীরতা নীরবকে স্পর্শ করলো। সে মৃদু হেসে বললো, “আমার তো মনে হচ্ছে, আমার জীবনের ২৫ বছরের অপেক্ষাটাই আজকে শেষ হলো।”
নীলি অবাক হয়ে নীরবের দিকে তাকালো। “কী বলছেন?”
নীরব এক মুহূর্ত থামলো। তারপর নীলির চোখে চোখ রেখে বললো, “আমি সত্যি বলছি নীলি। ২৫ বছরে বহু মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, কিন্তু কখনো কারো জন্যে আমার মনের ভেতরে কোনো দোলা লাগেনি। আজ সান্তাহার স্টেশনে আপনাকে প্রথম দেখার পর আমার মনে হয়েছে, আমার এই এতদিন নীরব হয়ে থাকা মনটা হঠাৎ শব্দ করে উঠলো। আমি বুঝতে পারছি না, এতো কম সময়ে আপনাকে আমার এতোটা ভালো কীভাবে লেগে গেলো!”
নীলি চুপ হয়ে গেলো। তার গালে হালকা লালচে আভা ফুটে উঠলো। সে লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিলো। ট্রেনের হুইসেলের শব্দ আর চাকার ছন্দের মাঝে এক নীরব নীরবতা নেমে এলো দু’জনের মাঝেÑযে নীরবতা কথার চেয়েও অনেক বেশি বাচাল।
কিছুক্ষণ পর নীলি হালকা স্বরে বললো, “হঠাৎ করে এত বড় একটা কথা বলে দেওয়া কি খুব সহজ?”
“না, সহজ নয়। তবে সত্যিটা চেপে রাখা আরো বেশি কঠিন। আমি আপনাকে হারানোর ভয় পাচ্ছিলাম। নাটোর পৌঁছে আপনি নেমে যাবেন, তারপর হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। তাই ঝুঁকিটা নিলাম।”Ñ নীরব সত্যটা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিলো।
নীলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ট্রেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। অন্ধকারের বুক চিরে ট্রেন ছুটে চলেছে সামনের দিকে। নীলির মনেও হয়তো কোনো দোলাচল চলছিলো।
অবশেষে নাটোর স্টেশন চলে এলো। ট্রেন থামার পর দু’জনে প্ল্যাটফর্মে নামলো। এবার বিদায়ের পালা।
নীরব ব্যাকুল দৃষ্টিতে নীলির দিকে তাকিয়ে রইলো। সে ভাবছিলো, এটাই কি তবে শেষ? সান্তাহার স্টেশনের সেই অনূভূতির কি কোনো পরিণতি হবে না?
নীলি ধীর পায়ে নীরবের দিকে এগিয়ে এলো। তার মুখে একটা সুন্দর মিষ্টি হাসি। সে নিজের ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরির ছেঁড়া পাতা বের করে নীরবের হাতে দিল।
“আপনার উত্তরটা এতে আছে। ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর খুলবেন,”Ñ ফিসফিস করে বললো নীলি।
নীরব কাগজটা শক্ত করে হাতে ধরে রাখলো। নীলি রিকশায় উঠে ধীরে ধীরে স্টেশনের বাইরে চলে গেলো। সে যতক্ষণ দেখা গেলো, নীরব অপলক তাকিয়ে রইলো।
রিকশাটা চোখের আড়াল হতেই নীরব হাতের কাগজটা খুললো। সেখানে নীলির পরিচ্ছন্ন হাতের লেখায় লেখা ছিলো:
“সান্তাহার স্টেশনে আপনি যখন আমার দিকে হেঁটে আসছিলেন, তখন আপনার চোখ দু’টিতে একটা অদ্ভুত সততা ছিলো। জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি, কিন্তু আপনাকে প্রথম দেখেই কেমন যেন নিজের মানুষ মনে হয়েছিলো। হয়তো সব ভালো লাগার পেছনে কোনো কারণ থাকে না, কিছু ভালো লাগা নিয়তির সিদ্ধান্ত। আমি নাটোরে অপেক্ষা করবো আপনার কলের জন্যে।Ñ নীলি”
নিচে নীলির ফোন নম্বরটা লেখা ছিলো।
রাতের নিঝুম নাটোর স্টেশনে দাঁড়িয়ে নীরব এক গভীর আনন্দের অনুভূতি অনুভব করলো। বাতাসটা তার চুলে বিলি কেটে গেলো। জীবনের ২৫টি বছর সে যে ভালোবাসার খোঁজ পায়নি, সান্তাহার স্টেশনের একটা সাধারণ বিকেল তাকে সেই ভালোবাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নীরব পকেট থেকে ফোনটা বের করে নীলির নম্বরে ডায়াল করলো। ট্রেনের হুইসেলটা যেন তাদের নতুন এক জীবনের সুর বাজিয়ে দিলো।
প্রকাশিত : সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬

















