

মিজানুর রহমান রানা :
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে মানব জীবনের উদ্দেশ্য কি? আসলে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এর কোরআন ও হাদিস ভিত্তিক সঠিক পরার্মশ পেতে কষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি এ বিষয়ে উল্লেখ করছি।

মানব জীবনের উদ্দেশ্য: ইসলামী দর্শনে এক অন্বেষণ
মানুষ কেন পৃথিবীতে আসে, তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—এই প্রশ্ন ইতিহাসজুড়ে মানবচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। ইসলাম এই অন্বেষণের একটি স্পষ্ট, গভীর এবং গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানব জীবনের উদ্দেশ্য শুধু জীবিকা, আরাম কিংবা সামাজিক উন্নয়ন নয়; বরং এটি এক আত্মিক ও নৈতিক যাত্রার নাম।
কোরআনের সূরা আয-যারিয়াতে আল্লাহ বলেন, “আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য”_ (৫১:৫৬)। এখানে “ইবাদত” অর্থ শুধু নামাজ, রোযা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ। ইবাদত এক বিস্তৃত ধারণা—যেখানে মানুষের প্রতিটি কাজ হতে পারে এক সৎ উদ্দেশ্যের অংশ।
হুজুরাত সূরায় বলা হয়েছে, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাশীল সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার”_ (৪৯:১৩)। এটি জানিয়ে দেয়, মানুষের সামাজিক অবস্থান নয়, বরং নৈতিকতা ও আল্লাহভীরুতাই মানব জীবনের আসল মানদণ্ড। অন্যদিকে, সূরা বাকারা মানবের চিন্তা ও জ্ঞানের শক্তিকে তুলে ধরে—“আল্লাহ আদমকে সবকিছুর নাম শিখিয়ে দিলেন” (২:৩১)। এই আয়াত মানব জাতিকে জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে তুলে ধরে, যারা স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বে সক্ষম।
রাসূল (সা.) বলেন, “আমি প্রেরিত হয়েছি চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনের জন্য”_ (সহিহ বুখারি)। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শেখায়, কীভাবে মানবতা, করুণা ও ন্যায়পরায়ণতাকে জীবনের অংশ বানিয়ে তোলা যায়। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, _“তুমি দুনিয়ার জন্য কাজ করো যেন তুমি চিরকাল বাঁচবে, আর আখিরাতের জন্য যেন কালই মৃত্যুবরণ করবে”_ (তাবারানি)। এর মাধ্যমে ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রচনার শিক্ষা দেয়।
ইসলামী দর্শনে মানব জীবনের উদ্দেশ্যকে তিনটি স্তরে দেখা যায়:
– আত্মিক: আল্লাহর ইবাদত ও নৈকট্য অর্জন
– নৈতিক : ব্যক্তিত্ব গঠন ও সমাজসেবা
– জ্ঞানভিত্তিক: চিন্তা, অন্বেষণ ও সঠিক পথ অনুসরণ
ইসলামী দর্শনে মানব জীবনের উদ্দেশ্যকে তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গভীর ও অর্থবহ। নিচে প্রতিটি স্তরকে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. আত্মিক স্তর: আল্লাহর ইবাদত ও নৈকট্য অর্জন
কোরআনের ভিত্তি:
“আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য।” — সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৫৬
➤ এটি মানব জীবনের মূল উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে: আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও বন্দেগি।
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় অনুসন্ধান করো।” — সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ৩৫
➤ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য ইবাদত, তাকওয়া ও সৎকর্মের নির্দেশ।
হাদিসের ভিত্তি:
– “আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা ফরজ ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হয়, এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।”— সহিহ বুখারির হাদিসে কুদসি নম্বর ৬৫০২
– “তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।”_
— তিরমিযি
২. নৈতিক স্তর: ব্যক্তিত্ব গঠন ও সমাজসেবা
কোরআনের ভিত্তি:
– “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার।” — সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৩
➤ নৈতিক উৎকর্ষই মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড।
– “তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক।” — সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ১৯
হাদিসের ভিত্তি:
– “আমি প্রেরিত হয়েছি চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনের জন্য।” — সহিহ বুখারি
এই হাদিসটি — “আমি প্রেরিত হয়েছি চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনের জন্য” — সহিহ বুখারিতে নির্দিষ্ট নম্বরসহ পাওয়া যায় না। এটি মূলত মুয়াত্তা মালিক, হাদিস নম্বর ১৬১৪-এ পাওয়া যায়, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তের উদ্দেশ্য হিসেবে উত্তম চরিত্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। অনেক ইসলামিক লেখক ও বক্তা এটি সহিহ বুখারির সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেন, কিন্তু সহিহ বুখারির মূল গ্রন্থে এই হাদিসটি সরাসরি এই শব্দে নেই। তবে চরিত্রের গুরুত্ব নিয়ে সহিহ বুখারিতে বহু হাদিস রয়েছে, যেমন:
– “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।” — সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৫
– “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।” — সহিহ বুখারি, বিভিন্ন অধ্যায়।
– “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুঃখ দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তার একটি দুঃখ দূর করবেন।”— মুসলিম
এই হাদিসটি — “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুঃখ দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তার একটি দুঃখ দূর করবেন” — সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৬৯৯ হিসেবে পাওয়া যায়। এটি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এবং এটি একটি বিস্তৃত হাদিস যেখানে আরও বলা হয়েছে:
– যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্তের জন্য সহজ করে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সহজ করবেন।
– যে ব্যক্তি মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।
– আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।
– যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।
এই হাদিসটি মানবিকতা, সহানুভূতি ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বকে একত্রে তুলে ধরে — এক কথায়, এটি ইসলামী জীবনদর্শনের এক অনন্য রত্ন।
– “বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।”— বুখারি
এই হাদিসটি পাওয়া যায় সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৬০০৬।
“বিধবা ও মিসকিনদের জন্য চেষ্টাকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং দিনে রোজাদার ও রাতে নামাজ আদায়কারীর সমতুল্য।” এই হাদিসটি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এবং এটি মানবসেবার গুরুত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরে—যেখানে সমাজের দুর্বল ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোকে ইবাদতের সর্বোচ্চ রূপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
৩. জ্ঞানভিত্তিক স্তর: চিন্তা, অন্বেষণ ও সঠিক পথ অনুসরণ
কোরআনের ভিত্তি:
– “আমি আদমকে সবকিছুর নাম শিখিয়ে দিলাম…”— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৩১
➤ জ্ঞান ও চিন্তাশীলতা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি।
– “তোমরা কি চিন্তা করো না?” — সূরা আন-নাহল, আয়াত ১১
➤ চিন্তা ও অন্বেষণকে কোরআন বারবার উৎসাহ দিয়েছে।
হাদিসের ভিত্তি:
– “যে জ্ঞান অর্জনের খোঁজে বের হয়, সে আল্লাহর পথে বের হয়।” — — সুনান আত-তিরমিযি, হাদিস নম্বর ২৬৪৭
– “যার দুটি দিন একই রকম কাটলো, সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো।” — আল হাদিস
➤ প্রতিদিন চিন্তা ও উন্নতির চর্চা ইসলামী জীবনের অংশ।
এই হাদিসটি — “যার দুটি দিন একই রকম কাটলো, সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো” — আল হাদিস নামে পরিচিত সংকলন থেকে উদ্ধৃত, তবে এটি প্রচলিত হাদিস গ্রন্থসমূহে (যেমন: বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি) নির্দিষ্ট হাদিস নম্বরসহ পাওয়া যায় না। অনেক ইসলামিক ওয়েবসাইট ও অনুপ্রেরণামূলক লেখায় এটি উদ্ধৃত হয়, কিন্তু বিশ্বস্ত হাদিস গ্রন্থে এর সুনির্দিষ্ট সূত্র বা নম্বর পাওয়া কঠিন। কিছু আলেম এটিকে দায়লামি বা অন্যান্য দুর্বল সূত্রের হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এর অর্থ ও শিক্ষা ইসলামী দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ: প্রতিদিন আত্মউন্নয়ন ও জ্ঞানচর্চা না করলে মানুষ পিছিয়ে পড়ে।
এই দৃষ্টিকোণ শুধু এক ধর্মীয় তত্ত্ব নয়, বরং তা জীবনের জন্য এক গাইডলাইন। ইসলাম আমাদের শেখায়—জীবন মানে শুধু অস্তিত্ব নয়, বরং তা এক অর্থবোধক যাত্রা, যার প্রতিটি ধাপ আমাদের দায়িত্ব ও বিকাশের সুযোগ।
বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শেয়ার করুন










