আমলাতন্ত্রের মাফিয়াতন্ত্র: ড. আহমদ কায়কাউসের উত্থান ও পতনের প্রতিচিত্র

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে কিছু চরিত্র এমনভাবে উত্থিত হয়েছেন, যাঁদের উত্থান শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ড. আহমদ কায়কাউস সেই নাম, যাঁর উত্থান রূপকথার মতো হলেও বাস্তবতা ছিল দুর্নীতির এক নির্মম বাস্তবচিত্র।

একজন মধ্যমানের আমলা কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে পৌঁছে যান, এবং কীভাবে তিনি আমলাতন্ত্রকে একটি মাফিয়াতন্ত্রে রূপান্তর করেন—এই প্রশ্ন আজ শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক।

এক অদ্ভুত উত্থান

ড. কায়কাউসের প্রশাসনিক যাত্রা শুরু হয় ৮৪ ব্যাচের একজন সাধারণ আমলা হিসেবে। মাঠ প্রশাসনে কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং অলৌকিকভাবে সরকারি চাকরিতে বহাল থাকেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার ক্ষমতার উত্থান।

এস আলমের ছায়ায় ক্ষমতার বিস্তার

ড. কায়কাউসের উত্থানের পেছনে অন্যতম নিয়ামক ছিলেন এস আলম, যিনি দেশের অন্যতম বিতর্কিত অর্থ পাচারকারী হিসেবে পরিচিত। এস আলমের লুণ্ঠন পরিকল্পনার বাস্তবায়নে একজন বিশ্বস্ত আমলার প্রয়োজন ছিল, এবং কায়কাউস সেই ভূমিকায় নিযুক্ত হন। এই সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি শুধু প্রশাসনিক পদে উন্নীত হন না, বরং দুর্নীতির এক দুষ্টচক্রের নেতৃত্বে আসেন।

 বিদ্যুৎ খাত: লুণ্ঠনের সূচনা

বিদ্যুৎ সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কায়কাউস ৩১টি কুইক রেন্টাল প্রকল্প অনুমোদন করেন। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়, যার একটি বড় অংশ তার পকেটে যায়। এই সময়েই তিনি শেখ হাসিনার পরিবারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরে তার প্রভাব বিস্তার লাভ করে।

মুখ্য সচিব হিসেবে সর্বময় ক্ষমতা

২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি পুরো আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গঠন করেন। বাজেটপ্রধান মন্ত্রণালয়গুলোতে তিনি নিজের অনুগত আমলাদের বসিয়ে দেন, যারা কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত হন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনকে একটি মাফিয়াতন্ত্রে রূপান্তর করেন।

ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতের ধ্বংস

বাংলাদেশ ব্যাংকে একজন আমলাকে গভর্নর হিসেবে বসিয়ে তিনি ব্যাংকিং সেক্টরে লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্য তৈরি করেন। আবদুর রউফ তালুকদার ছিলেন তার নির্দেশনাধীন, যিনি ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেন। এই সময়েই বাংলাদেশে অর্থ পাচার ও ঋণ খেলাপির হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পায়।

করোনা সংকটে দুর্নীতির মহোৎসব

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়, কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। টিকা আমদানিসহ চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, যার মধ্যে মাত্র ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। বাকি অর্থ লুণ্ঠিত হয়, এবং এর বড় অংশ তার কাছে যায়।

 আশ্রয়ণ প্রকল্প: সামাজিক বেষ্টনীর নামে লুট

গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে আমলাদের দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করিয়ে তিনি কমিশন আদায় করেন। আমলারা পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিনিময়ে এই দুর্নীতিতে অংশ নেন। প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়।

আন্তর্জাতিক অবস্থান ও দায়মুক্তি

বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং একটি লবিস্ট ফার্মে কর্মরত। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও, কোনো কার্যকর তদন্ত বা বিচার হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু অনুসন্ধান শুরু করলেও তা ধামাচাপা পড়ে গেছে।

নৈতিক প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

ড. আহমদ কায়কাউসের কাহিনি শুধু একজন আমলার দুর্নীতির গল্প নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের প্রতিচিত্র। একজন আমলা কীভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে দিতে পারেন, তা আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে স্পষ্ট করে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—এই ধরনের ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে কি না? রাষ্ট্র কি তার নৈতিক দায়িত্ব পালন করবে, নাকি দুর্নীতির এই দানবেরা বারবার দায়মুক্তি পাবে?

তথ্যসূত্র : দ্যা মনিং সান, বণিক বার্তা, জাগো নিউজ

বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

 

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

You might like

About the Author: priyoshomoy