
ক্ষুদীরাম দাস :
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ যেন ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত সুর বুনছিলো। পুরোনো কাঁচের জানালায় জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো বেয়ে নামছিলো নিচের দিকে, যেন প্রতিটি ফোঁটার সাথে বহমান হচ্ছে জীবনের গল্প। কাঁচা ইটের তৈরি ছোট্ট ঘরটিতে ভেজা মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিলো। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি তীব্র হলেও ভেতরে সেই পরিবারটি বসেছিলো একসাথেÑদরিদ্র হলেও তারা যেন আশার বাতিঘর।

এ পরিবারটির কর্তা হরিদাস পাল। গ্রামের সাধারণ কৃষক। জমি বলতে সামান্য কিছু ধানক্ষেত, সেটাও প্রায়ই বন্যায় বা খরায় নষ্ট হয়ে যায়। তারপরও তিনি পরিশ্রমে পিছপা হন না। তাঁর স্ত্রী শীলা পাল, নিরহঙ্কার ও সাহসী এক নারী। সংসারের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন তিনি হাসিমুখে সামলান। তিন সন্তানের ছোট্ট এ পরিবারটা অভাবের মধ্যে থেকেও ভালোবাসার আলোয় ভরে উঠেছে।
হরিদাস পাল কখনো সন্তানদের কাছে লুকাননি যে তাদের পরিবার গরিব; বরং তিনি তাদের শিখিয়েছেনÑ “অভাব মানুষকে ভেঙে দেয় না, অভাব মানুষকে শক্ত করে। যে মানুষ কষ্ট বুঝে, সেই মানুষ সত্যিকারের বড় হয়।”
বড় ছেলে অমিত পাল ক্লাস নাইন-এ পড়ে। লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো, কিন্তু প্রায়ই বই কেনার টাকা জোগাড় করতে পারে না। বন্ধুদের মতো নতুন ব্যাগ, দামি কলম তার নেই। তবুও সে কখনো হতাশ হয় না। গ্রামের পাঠাগার থেকে বই ধার করে পড়ে; আর পুরোনো খাতার ফাঁকা পাতায় লিখে যায় তার স্বপ্ন।
একদিন স্কুলে শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,
“অমিত, তোমার স্বপ্ন কী?”
অমিত দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলো,
“স্যার, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। যাতে গরিব মানুষ বিনা টাকায় চিকিৎসা পায়।”
শিক্ষকের চোখ ভিজে উঠলো। কারণ তিনি জানতেনÑএ ছেলেটার বাড়ি অভাবে জর্জরিত। কিন্তু তার স্বপ্নগুলো অভাবের দেয়ালে আটকে নেই।
ছোট মেয়ে মিতা পাল আবার অন্য রকম। তার শখÑআঁকা। কাগজ-কলম না পেলে সে মাটিতে কাঠি দিয়ে ছবি আঁকে। তার চোখে ভবিষ্যতের রঙিন ক্যানভাস।
আর সবার ছোট রনি পাল। সে দুষ্টুমি করে, তবে যখন দেখে মা-বাবা কষ্ট করছে, চুপচাপ গিয়ে গরুর ঘাস কাটতে সাহায্য করে। বয়স কম হলেও দায়িত্ববোধ যেন জন্মগতভাবে পেয়েছে।
শীলা পাল প্রায়ই সন্তানদের বলেন,
“আমরা গরিব, এটা আমাদের লজ্জার নয়। লজ্জার হলো অসৎ পথে টাকা কামানো। মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে সততা আর পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
তিনি দেখেছেন, পাশের ধনী পরিবারগুলো অঢেল অর্থে ভেসে যাচ্ছে। তাদের বাড়িতে নতুন আসবাব, দামি জামাকাপড়, মুঠোফোনÑসব আছে। কিন্তু সেখানকার সন্তানরা বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। চাকর-বাকরদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। পড়াশোনার চেয়ে বিলাসিতায় বেশি সময় দেয়।
অন্যদিকে তার সন্তানরা অভাবে থেকেও প্রতিটি জিনিসকে মূল্য দিতে শিখেছে। একটি কলম ফুরোলে সেটিকে মাটিতে গড়িয়ে খেলনা বানিয়ে নেয়, একটি জামা যতœ করে পরিধান করে বছরের পর বছর।
অভাবী মানুষকে সমাজ সহজে সম্মান দিতে চায় না। বাজারে গেলে হরিদাস পালকে অনেক সময় অপমান সহ্য করতে হয়। একদিন তিনি দোকান থেকে ধার চাইলেনÑ
“ভাই, একটু চাল-ডাল দেন, ক’দিন পর টাকা দিয়ে দেব।”
বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫













