
ক্ষুদীরাম দাস :
অর্নবের জীবন ছিলো বড় সাধারণ, যেন এক পুরোনো, ধূসর ক্যানভাস। একটা সরকারি দপ্তরে ঝাড়–দারের কাজ করে তার দিন কাটতো। সারাদিন ঝাঁট ওেয়া, মেঝে মোছা, আর বাবুদের টেবিলে চা পৌঁছে দেয়া। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হলেও, তার সততা ছিলো পাহাড়ের মতো অটল। অন্যায়ের কাছে সে কোনোদিন মাথা নত করেনি; জীবনের কাছে হাজারোবার নত হয়েও তার মেরুদÐ ছিলো ঋজু। তার জীবনের এ সাদামাটা ক্যানভাসে রঙের প্রলেপ এনেছিলো তার স্ত্রী, অন্তরা। একই দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মী সে। পড়াশোনায় দারুণ মেধাবী, পোশাকে-আশাকে মার্জিত, আর আত্মবিশ্বাসে ঝকঝকে। সহকর্মীরা প্রায়ই ঈর্ষার চোখে বলতো, “অর্নব, তুমি বড় ভাগ্যবান, এমন একজন অফিসারের স্বামী হয়েছ।”

শুরুর দিনগুলো যেন এক মিষ্টি স্বপ্নের মতো ছিলো। অর্নব অন্তরাকে দেখলে বুক ভরে গর্বে। যখন দেখত সবাই অন্তরাকে শ্রদ্ধা করছে, অর্নব মনে মনে ভাবতো, “এ সম্মান যেন আমারও।” তার গর্বিত বুকের মাঝে এক গভীর তৃপ্তি অনুভব করত, যেন সেও এই সম্মানের অংশীদার। কিন্তু সময় কারো জন্যে অপেক্ষা করে না, জীবনের বাতাসও তার দিক পরিবর্তন করে। অন্তরার জীবনে আগমন হলো এক নতুন মানুষের, রনোÑঅফিসেরই এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মিটিং, প্রজেক্ট, অফিস ট্যুরÑএইসব অজুহাতে অন্তরা প্রায়ই রাত করে ফিরত। কখনো কখনো তো ফিরতই না।
অর্নব দরজার পাশে বসে দীর্ঘ অপেক্ষায় রাত কাটাতো। তার কানে শুধু প্রতিধ্বনি বাজত, “আজ হয়তো ফিরবে…” কিন্তু নীরবতা ছাড়া আর কোনো উত্তর সে পেতো না। একদিন গভীর রাতে, বুকের ভেতরে জমা কষ্ট আর অভিমান নিয়ে অর্নব সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল, “অন্তরা, এতো রাত কেন হয় তোমার ফিরতে?”
অন্তরার বিরক্ত স্বর যেন অর্নবের বুকের গভীরে কাঁটার মতো বিঁধেছিল। “তুমি বুঝবে না অর্নব। তোমার আর আমার জগৎ আলাদা। তুমি তো শুধু একজন ঝাড়–দার।” অর্নব আর কোনো কথা বলেনি। শুধু তার হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেছিল সে, যেন কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
তারপর এক বিকেলে, নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে গেল অফিসের এক নিভৃত কক্ষে। ঘরের ভেতর আলো-আঁধারিতে অন্তরা আর রনোকে খুব কাছাকাছি দেখেও অর্নব কোনো শব্দ করেনি। কিন্তু তার চোখ দুটো যেন সব বুঝে নিয়েছিল। তার দৃষ্টিতে ছিল না কোনো ক্রোধ, ছিল কেবল গভীর হতাশা আর এক নীরব যন্ত্রণা।
সেই দিনের পর থেকে অর্নব আর অফিসে যায়নি। অন্তরা রাতে ফিরেছিল, একরাশ কৈফিয়ত আর ব্যাখ্যা নিয়ে। অর্নব শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তোমার সম্পর্ক নিয়ে আমি কোনো প্রতিশোধ চাই না। কিন্তু আমার কষ্ট হয়েছে এই ভেবে, তুমি আমাকে এমন একজনের চেয়েও ছোট ভেবেছ, যাকে আমি প্রতিদিন চা দিয়ে যাই।”
এ কয়েকটি কথা যেন অন্তরার সমস্ত আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিয়েছিল। অর্নব চলে গেল অন্য শহরে, তার অসম্মানের প্রাচীর ভেঙে নতুন জীবন গড়তে। সে এখন অন্য এক সরকারি দপ্তরে কাজ করে, একই ধরনের কাজ, কিন্তু সে বদলে গেছে। ফাঁকা সময়টা কাজে লাগিয়ে দূরশিক্ষায় বি.এ. পড়ছে, নিজের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য, নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় লেখার জন্য।
অন্তরা? সে আজও অফিসার, পদমর্যাদা আছে, কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি থেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে গেছে। সহকর্মীরা জানে, “অর্নব তাকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু একবারও তাকে অপমান করেনি।” অন্তরার মনে যেন এক চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে, যা কোনো পদমর্যাদা বা সাফল্য দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।
শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫













