জ্ঞানের নৌকা : ক্ষুদীরাম দাস

দীপ্তর চোখে তখন হতাশার মেঘ। শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “স্যার, এত বই পড়লাম, কিন্তু কিছুই তো মনে নেই! তাহলে কি লাভ হলো?”

শিক্ষক মুচকি হাসলেন। “কাল বিকেলে নদীর ধারে এসো, দীপ্ত। সেখানেই তোমার উত্তর পাবে।”

পরদিন বিকেলে দীপ্ত নদীর ধারে গেল। শিক্ষক তাকে একটি ছেঁড়া ও জীর্ণ জাল দেখিয়ে বললেন, “এই জালে করে আমাকে নদীর গভীর থেকে সবচেয়ে সুন্দর নুড়িটি এনে দাও।”

দীপ্ত অবাক হলো। “কিন্তু স্যার, এটা তো ছেঁড়া জাল! এতে করে কীভাবে নুড়ি আনবো?”

শিক্ষক বললেন, “চেষ্টা করে দেখো।”

দীপ্ত অনিচ্ছাসত্তে¡ও জালটি নিয়ে নদীর গভীরে নামল। সে নুড়ি খুঁজতে লাগল। যতবারই সে একটি নুড়ি জালে ভরল, ততবারই সেটি ছিদ্র দিয়ে পড়ে গেল। বারবার চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হলো। তার হাত-পা ক্লান্ত, মন হতাশ। সে ফিরে এসে শিক্ষককে বলল, “স্যার, আমি পারিনি। এই ছেঁড়া জালে নুড়ি আনা অসম্ভব।”

শিক্ষক দীপ্তর মুখের দিকে তাকালেন। “তুমি কি সত্যিই ব্যর্থ হয়েছো?”

দীপ্ত মাথা নিচু করে রইল।

শিক্ষক বললেন, “একবার তোমার হাতের দিকে তাকাও।”

দীপ্ত তাকাল। তার হাতে লেগে থাকা কাদা ও ময়লা জলের স্রোতে ধুয়ে গেছে। তার হাতের ত্বক এখন অনেক পরিষ্কার।

শিক্ষক বললেন, “তোমার হাতের মতো তোমার মনও। তুমি যত বই পড়েছ, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য তোমার মনে জমে থাকা অন্ধকার, কুসংস্কার আর ভুল ধারণাগুলোকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রতিটি বইয়ের জ্ঞান তোমার মনের ভেতরের ময়লাগুলোকে বের করে দিয়েছে।”

“তুমি হয়তো বইয়ের সব তথ্য মনে রাখতে পারোনি, কিন্তু বইয়ের জ্ঞান তোমার মনকে দিয়েছে এক নতুন আলো, এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান মুখস্থ করা নয়, বরং মনের ভেতরের দিকটাকে আলোকিত করা। এই আলোকিত মন দিয়েই তুমি জীবনের পথে চলতে পারবে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।”

দীপ্তর চোখে তখন নতুন এক আলো দেখা দিল। তার হতাশার মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে জ্ঞানের সূর্য ঝলমল করে উঠল।

শেয়ার করুন
বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

You might like