

জ. ই. মামুন :
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে অনেক দিন আগে একটা টক শো করেছিলাম এটিএন বাংলায়। মির্জা সাহেব তখনও বিএনপির মহাসচিব হননি আর মতিয়া চৌধুরী তখন কৃষি মন্ত্রী। আমরা রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছি এবং মতিয়া আপা তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বেশ কয়েকবার গলার স্বর উঁচু করে রাগতভাবে কথা বলেছেন। ফখরুল সাহেব গলা উঁচু করেননি, ঠান্ডা মাথায় যুক্তি নির্ভর উত্তর দিয়েছেন বা বিতর্ক করেছেন।

অনুষ্ঠান শেষে দুই অতিথিকে বিদায়ের জানাতে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছিলাম, তখন মির্জা ফখরুল মতিয়া চৌধুরীকে বললেন, “আপা রাজনীতি করতে গেলে তো অনেক কথা বলতে হয়, আমার কোনো কথায় আপনি মনে কষ্ট নিয়েন না। আপনাদের কাছ থেকেই তো রাজনীতি শিখেছি।”
তাঁর কথা শুনে মতিয়া চৌধুরী ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন একটা হাসি দিলেন, সর্বদা রাগী ভাবমূর্তির মতিয়া আপা যে এত সুন্দর করে, এত মায়াবী করে হাসতে পারেন, আমার জানা ছিলো না। বললেন, “আমি কিছু মনে করিনি, আপনিও আমরা কথায কিছু মনে করবেন না।” আমি মনে করি এটাই হলো রাজনীতির শিষ্টাচার বা শুদ্ধাচার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটা ভিডিও খুব ভাইরাল হয়েছিলো। বিজয় সরণির ওই দিক দিয়ে যাবার সময় তিনি দেখেন, কিছু ছেলেপেনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুর্তি ভাঙছে। তিনি বলেন, “আমার খুব খারাপ লাগলো, কারণ শেখ সাহেব তো আমাদের নেতা ছিলেন।” আমি মনে করি এটাও রাজনৈতিক শিষ্টাচার, ভদ্রতা।
রাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শুদ্ধাচার, শিষ্টাচার, নম্রতা- ভদ্রতা দিন দিন উঠে যাচ্ছে। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে অশ্লীল- অশ্রাব্য গালি গালাজ। কিন্তু এই অদিনেও যে অল্প সংখ্যক নেতা রাজনীতিতে শুদ্ধতা ও শিষ্টাচার টিকিয়ে রেখেছেন তাদের অন্যতম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০১১ সালে বিএনপি মহাসচিবের (প্রথমে ভারপ্রাপ্ত ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ) দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে গত ১৫ বছর রাজনীতির কতটা কঠিন পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন তা তার দলের লোকজন যেমন জানে, আমরা সাংবাদিকরা জানি, দেশবাসীও জানে। নিকট অতীতে বিএনপি এত কঠিন সময় আর পার করেনি। দলের শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতা দেশান্তরে, দেশের নেতাদের অনেকে কারাগারে, তিনি নিজেও দুদিন পরপরই গ্রেপ্তার হন, জামিন পান আবার গ্রেপ্তার হন- আমার ধারণা সাম্প্রতিককালে রাজনীতিবিদদের জেলে যাওয়ার হিসেবে তিনি শার্ষস্থানে আছেন। এমন প্রতিকুল সময়ে দলকে সংগঠিত রাখা, সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া এবং দলের কারারুদ্ধ এবং পলাতক নেতাকর্মী, গুম খুনের শিকার নেতা কর্মীদের পরিবার- সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে টিকে থাকা সহজ কাজ নয়। সেই কঠিন কাজটি মির্জা ফখরুল সাহেব অনেক দিন ধরে সাফল্যের সাথেই করে আসছেন।
নানা চড়াই উতরাই, আলো অন্ধকার পার হয়ে বিএনপি এখন নতুন সূর্যালোকে উদ্ভাসিত। আজ বাদে কাল তারা সংসদে দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এমন সময় চারিদিকে একটা কথা শুনছি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি নন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ওই পদে আসীন ব্যক্তির হাত পা থাকে বাঁধা। নিজের মতো করে কিছুই করতে পারেন না তিনি।
অন্যদিকে, দেশে এখন যারা রাজনীতি করছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে পোড় খাওয়া, সবচেয়ে দক্ষ এবং সবচেয়ে সৎ ও যোগ্য রাজনীতিকদের একজন মির্জা ফখরুল। তাঁর মতো একজন দক্ষ নেতাকে এখনই হাত পা বেঁধে সোনার খাঁচায় পুরে দেওয়ার মানে হলো দেশের একজন যোগ্য রাজনীতিবিদকে চিরতরে বিসর্জন দেয়া।
আমি চাই মির্জা ফখরুল সাহেব আপাতত মন্ত্রী থাকুন। তিনি স্থানীয় সরকার বা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিন। তাহলে তার মন্ত্রণালয়ে অন্তত দুর্নীতির অভিযোগ আসবে না, অলসতার অভিযোগ আসবে না, অযোগ্যতার অভিযোগ আসবে না। সেখানে কাজ হবে স্বচ্ছ এবং দ্রুতগতির। তাঁকে আমলা বা অন্যরা ভুল বোঝাতে পারবে না, তিনি তার মন্ত্রণালয়কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন বলে আশা করি। আমি চাই তিনি আরো অনেক দিন সুস্থ থাকুন এবং নির্বাহী দায়িত্বে থাকুন। দল তাঁকে বাড়তি সম্মান দিতে চাইলে সংসদ উপনেতাও করতে পারে। তবে বঙ্গভবনে এখনই নয়!
প্রকাশিত : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.













