

ছোট গল্প
ধড়িবাজ
লেখক : ক্ষুদীরাম দাস
(প্রিয় পাঠক, এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে যায় যদি,
তবে সেটা কাকতালীয়। লেখক হিসেবে দায়ী করা ভুল হবে।)

এক.
প্রতিদিনই এই গ্রামের মানুষজন এই চা দোকানে আড্ডা জমায়। এটা প্রতিদিনের রুটিমাফিক হয়ে গেছে। গ্রামবাসী সারাদিন নদীতে নৌকা চালায়। নদীর এপার থেকে ওপড়ারে মানুষজনকে পার করে দেয়। এটাই তাদের এখন জীবিকা। এছাড়া তারা অন্য কোনো পেশায় যেতে পারে না। দীর্ঘদিন থেকেই তাদের নৌকা চালানোর অভ্যাস। এই পেশা ছাড়া তারা অন্য কিছু চিন্তাই করতে পারে না। তাদের বেঁচা থাকার অবলম্বন এই নদী পাড়াপাড়। প্রতিদিন তাদের যে আয় হয় তা দিয়েই তাদের জীবন চলে কোনো রকমে।
চা দোকানের আড্ডাটা বেশ জমে উঠে। যদি হয় বিশেষ কোনো উপলক্ষে তাহলে তো কথাই নেই। আর আলোচনা-সমালোচনা সেটা তো প্রতিনিয়ত চলতেই থাকে। তবে আজ নেতা আমজাদকে নিয়ে ভীষণ আলোচনা চলছে। সে এই এলাকার নেতা হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন সে এলাকায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
মানুষ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তার জীবন অন্য রকম। সে এটাই চেয়েছিলো এবং এটাই সে সবসময় চায়। কেউ কেউ আবার ক্ষমতার বড়াইও করে থাকে। কিন্তু ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে গেলে সেই ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্যে তার চেষ্টার শেষ থাকে না। নেতা আমজাদ সেই ক্ষমতার জন্যে মরিয়া হয়ে গেছে। এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। কোথায় কোথায় কার কাছে যাওয়া যায়, কার কাছে গেলে তার কাজ হবে সেই চেষ্টা সবসময় করতে থাকে। তাকে যে ক্ষতা ফিরে পেতেই হবে সেই চেষ্টা করতে থাকে।
নেতা আমজাদ বেশ হাসিমুখে চায়ের দোকানে ঢুকলো। চায়ের দোকানে থাকা সাধারণ মানুষজন অনেকটা অবাক হয়ে গেলো। কারণ, এভাবে এই নেতা মানুষটাকে কোনোদিন হাসিমুখে চায়ের দোকানে ঢুকতে দেখেনি। সকলের সাথে হাত মিলিয়ে কৌশল বিনিময় করলো নেতা আমজাদ। তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিলো।
প্রথম গ্রামবাসী বললো ঃ নেতা সাহেব! আজ কিন্তু আপনাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।
নেতা আমজাদ ঃ ধন্যবাদ ভাই। আপনাকেও সুন্দর লাগছে।
পেছন থেকে একজন গ্রামবাসী আরেকজনকে ফিসফিস করে বললো, এবার বুঝতে পেরেছি। গতকাল কেন নেতা আমজাদ আমাকে চা খাওয়াছিলো। সামনে তো প্রতিদ্ব›িদ্বতা আছে সে কারণেই। যেন তাকে ভোটটা দিই। আর নারে ভাই, আর না।
পাশ থেকে আরেকজন খোঁচা দিয়ে বললো, এই চুপ কর তো। কোনো কথা বলিস না। যা করবি নীরবে করবি। জীবনের কিছু কাজ নীরবে করতে হয়। চুপি চুপি করতে হয়। প্রকাশ্যে করা যায় না। করা উচিতও নয়। এখন শুনতে থাক, নেতা আমজাদ কী কী বলে!
একটি চেয়ারে টেনে নিয়ে গ্রামবাসীঃ বসুন! এই খানে বসুন।
নেতা আমজাদ ঃ ধন্যবাদ আপনাকে।
নেতা আমজাদ চেয়ারে বসললেন। এরপর কিছুটা নীরব থেকে সকলের দিকে হাসিমুখে একবার তাকালেন। সকলের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। তারপর কাশি দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনারা এলাকার সম্মানীত লোক। সামনের নির্বাচনের কথা আপনারা মনে রাখবেন। আমি বিশ^াস করি, আপনারা আমাকে খুবই ভালোবাসেন। আমিও আপনাদের ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি। অতীতে আমি আপনাদের অনেক সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। আগামীতেও আমার বিশ^াস, আপনারা আমাকেই সুযোগ দিবেন। বর্তমানে যে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তার কাছ থেকে অনেক অত্যাচারিত হতে হয়েছে আপনাদের। সে আপনাদের কোনো উপকার করেনি। আপনাদের কোনো দাবি সে পূরণ করতে পারেনি। তার তো কোনো যোগ্যতাই ছিলো না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে, তার জন্যে আপনারা এখন অনেক কষ্টে আছেন। আপনাদের এখন অনুশোচনা হচ্ছে। আপনারা ভুল করেছেন। আশা করি, সামনের দিনগুলোতে আপনারা আর ভুল করবেন না। এইবার আপনারা সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন। আমি আপনাদের সেবা করতে চাই। সুতরাং দয়া করে আপনারা আমাকেই ভোটটা প্রদান করবেন।
কথা বলা শেষে কিছুটা সময় নীরব থেকে সকলের দিকে আবারো নেতা আমজাদ হাসিমুখে তাকালেন। মাথা নেড়ে চা দোকানে বসে থাকা সকলে সম্মতিসূচক জবাব দিলেন। কিন্তু মনের ভেতর তাদের অন্যরকম চিন্তা। সিদ্ধান্ত এখন তাদের হাতেই। সুতরাং এখানে বাধা দেয়ার কেউ নেই।
দুই.
এবারের নির্বাচনে নেতা আমজাদ জয়ী হতে পারেনি। তাই তার মাথা খারাপ। ভীষণ ক্ষুব্ধ মাঝিদের উপর, গ্রামবাসী সকলের উপর। তারা যদি ভোট দিতো তাহলে সে জয়ী হতে পারতো। কিন্তু তারা কেউ নেতা আমজাদকে ভোট দেয়নি। সকলে একজোট হয়ে তাদের পরাজিত করেছে। মনের মধ্যে ভীষণ জ¦ালা শুরু হয়েছে।
এ ধরনের নেতাদের যখন কতৃত্ব শেষ হয়ে যায়, তারা সেই নেতৃত্ব পাওয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠে। যে করেই হোক সেই নেতৃত্ব পেতে হবে। নেতা আমজাদের বেলায়ও সে রকম চিন্তা মাথায় চলে এসেছে। গ্রামের প্রায় সকলেই ছিলো জেলে। তারা অশিক্ষিত ছিলো। কিন্তু তাদের মাথায় কেন এ ধরনের চিন্তা ঢুকলো, সেটা চিন্তা করে কোনো কূলকিনারা খোঁজে পায় না নেতা আমজাদ। আবার তাদেরকে কে নেতৃত্ব দিচ্ছে সেটাও তার মাথায় আসে না। এসব ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে নেতা আমজাদের। আক্রোশ জন্ম নিয়েছে নেতা আমজাদের মনের মধ্যে। যে করেই হোক এই জেলেদের ক্ষতি করতে হবে। নিজে নেতা না হতে পারলেও তাদেরকে কিভাবে সর্বনাশ করা যায় এবং ক্ষতি করা যায় সেই চেষ্টা করতে লাগলো।
কোনো কোনো জেলে আবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কারণ, নেতা আমজাদ একজন ধড়িবাজ ব্যক্তি। সে যে কীভাবে কার ক্ষতি করবে সেটা বলা মুশকিল। তার চালাকি কেউ বুঝতে পারে না। সুতরাং সকলকে জেলেই খুবই সতর্কতার সাথে জীবনযাপন করছে।
তবে যতই সাবধানে থাকুক না কেন ধড়িবাজ মানুষের হাত থেকে বাঁচা এত সহজ নয়।
নেতা আমজাদের মাথায় একটা কুবুদ্ধি চলে এলো। সে এমন একটা কাজ করতে চলেছে সেই কাজটি করতে পারলে তার চালাকি কেউ ধরতে পারবে না। এই ভেবে সে বড় লিডারের কাছে চলে গেলো তার সিদ্ধান্তের কথা জানাতে। কিন্তু এখন লিডারের কাছেও যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ, পরাজয়ের মুখ নিয়ে তার কাছে গেলে নিশ্চয় গালাগালি শুনতে হবে। সুতরাং আর কয়েকটি দিন পরে তার সাথে দেখা করে তার সিদ্ধান্তের কথা জানাতে হবে।
বেশ কিছুদিন পর নেতা আমজাদ গেলো লিডারের কাছে।
লিডারকে দেখার সাথে সাথে কড়জোড়ে এগিয়ে গিয়ে সম্মান জানালো। আশপাশে মানুষ থাকায় পা টুকু ছোঁয়নি মাত্র। তা না হলে লিডারের পায়ে পড়তো। নেতা আমজাদ চারিদিক তাকিয়ে দেখলো অনেক লোক আছে। এখন আর অন্য কিছু করা যায় না। শুধু ফিস ফিস করে বললো, আপনার সাথে একটা জরুরী কথা আছে।
কথাটি শুনে লিডার গুরুত্ব দিলো। এভাবে কথা বললে লিডাররা সঙ্কেত বুঝতে পারে। তারা গুরুত্ব দেয় বেশি। লিডার নেতা আমজাদের হাত ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলো। তারপর বললো ঃ তোমার কী এমন কথা যে, তোমার কথা খুবই জরুরী।
নেতা আমজাদ ঃ দুই দুইবার হেরেছি। তার কারণ হলো, ছোট নদীটার উপর একটা সেতু তৈরি করা চাই। নদীর দুই তীরের মানুষের দাবি। এটা যদি করতে পারি, তাহলে আমার নেতা হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না।
লিডার ঃ তুমি তো দারুণ কথা বলেছো। এই কথাটি তুমি আমাকে আগে জানাওনি কেনো।
নেতা আমজাদ ঃ তখন বলার সুযোগ পাইনি। গ্রামবাসীর উপকার করার এই একটা সুযোগ। যদি আপনি সেতুর ব্যবস্থা করতে পারেন, তাহলে তাহলে আমি সামনের নির্বাচনে নেতা হয়ে যাবই।
লিডার ঃ হবে হবে। অবশ্যই হবে। তোমার ঐখান থেকে আমার ভোটের দরকার আছে। আচ্ছা, তুমি এখন যাও। আমি তোমার সেতুর ব্যবস্থা করছি।
নেতা আমজাদ মনের খুশিতে চলে আসতে থাকে। আজ সে এতো খুশি যে, এর আগে এমন খুশি হয়নি। তার কাছে ভীষণ ভালো লাগছে। এই বার গ্রামবাসীদের শায়েস্ত করা যাবে। নৌকার মাঝিদের পেটের ভাত মরে যাবে। তাদের কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। বৈঠা হাতে আর কাউকে দেখা যাবে না। কেউ আর তাদের নৌকায় নদীপাড় হবে না। সবাই সেতু দিয়ে হাঁটাচলা করবে। তারা বেকার হবে। না খেয়ে মরবে। নেতা আমজাদ মনে মনে হাসতে থাকে।
বিকেলে ঘুরতে ঘুরতে নেতা আমজাদ নদীর পাড়ে আসলো। নৌকার মাঝিরা যে যার মতো নৌকাভর্তি মানুষ পাড়াপাড় করছে। এরপার থেকে ওপারে মানুষজন প্রয়োজনে যাতায়াত করছে। অবশ্য এভাবে যাতায়াত করতে হয় বলে, টাকা বাঁচাতে কেউ কেউ দিনে একবার প্রয়োজনের তাগিদে যাতায়াত করে। মন চাইলেই নদীর পাড় ওপারে কেউ যায় না। নদীর দুই পাড়ের মানুষের অভাব আছে। সুতরাং সেতু হলে সকলেরই ভালো হবে। দূর থেকে আসা মানুষজন সেতু দিয়ে পার হবে। তাদের আর কষ্টের টাকা নৌকার মাঝিকে দিতে হবে না।
সেতু হবার কথা শুনে অনেকেই খুশি হয়। গাড়ি চলতে পারবে। মানুষজন ঘুরতে আসতে পারবে। হাঁটাহাঁটি করতে পারবে। কিন্তু এদিকে যে, নৌকার মাঝিদের পেটের ভাত মরে যাবে সেটা কম মানুষেরই ভাবনায় এসেছে। শুধুমাত্র নৌকার মাঝিদের মাথায় বাড়ি পরেছে।
সেতুর কাজ চলছে ছয় মাস হয়ে গেলো। আর একমাস পরই সেতুর সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে। গ্রামবাসীর যত লোক ছিলো সকলেই নেতা আমজাদের কাছে ছুটে হলো। কারণ, নেতা আমজাদ অনেক ধনী ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং তার কাছে আসলে তাদের কোনো বেঁচে থাকার গতি হতে পারে।
নেতা আমজাদকে দেখে কয়েকজন বলতে লাগলো, ভাই নেতা আমজাদ আমরা এখন কী করবো ভাই?
নেতা আমজাদ ঃ আমি তো তোমাদের এখন জনে জনে বোঝাতে পারবো না, তোমরা এখন কী করবে? আমি কী করতে পারি তোমাদের জন্যে? তোমরা কী করতে চাও তোমরাই জানো। তোমরা তো আমাকে ভোট দেওনি। তোমরা আমরা ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছো। আমাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছো।
একজন বললো, ভাই, যদি সেতুটা না হতো তাহলে আমাদের কাজের অভাব হতো না। আমাদের তো ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেলো। আমাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেলো। আমরা এখন বেকার হয়ে গেলাম।
নেতা আমজাদ ঃ এই সেতু আমি তৈরি করতে বলেছি। লিডারকে বলেছি, যেন এখন সেতু তৈরি করে। মানুষের উপকার হবে। মানুষের যাতায়াতে সুবিধা হবে।
একজন বললো, কিন্তু আপনি তো আমাদের কথা মোটেও চিন্তা করলেন না। আপনি তো অন্যদের উপকার করলেন। কিন্তু আমাদের তো ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেলো।
নেতা আমজাদ ঃ তোমরাও তো আমার কখা চিন্তা করনি। কিন্তু আমি তো এখন ভালো কাজই করেছি। তোমাদের ক্ষতি আমি কী করে করলাম?
কোনো এক মাঝির স্কুল পড়–য়া ছেলে ক্ষ্যাপে গিয়ে চিৎকার করে বললো, ধড়িবাজ!
সাথে সাথে সকলে নীরব হয়ে গেলো।
নেতা আমজাদ চারিদিক তাকিয়ে দেখলো সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। নেতা আমজাদ চেঁচিয়ে বললো, কে আমাকে ঘড়িবাজ বলেছে? কে আমাকে ঘড়িবাজ বলেছে? কার এতো বড় সাহস!
ঐ ছেলেটি নেতা আমজাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে মনে মনে বললো, ধড়িবাজ! ঘড়িবাজ! ধড়িবাজ! ঘড়িবাজ! আমাদের পেটের ভাত কেড়ে নিলি?











