আমরা চাই শিশুরা খেলুক, শিশুরা হাসুক, শিশুরা গড়ুক আগামীর পথ

সম্পাদকীয়

এ পৃথিবী আমাদের জন্যে; পর্যায়ক্রমে আমাদের শিশুদের জন্যে। তাই শিশুদের জন্যে সুন্দর পৃথিবী উপহার দেয়া আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। কেননা শিশুরা আমাদেরই সন্তান। তাদের তাদের জন্যে আমাদেরকে পৃথিবী প্রস্তুত করতে হবে। শিশুদের মানুষ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলের। তাই এখন থেকে আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার। অন্যথায় আমরা তাদের জন্যে সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে পারবো না।

আমরা আমাদের চারিদিকে তাকালে অস্থিতিশীলতা দেখতে পাই। আর সেই অস্থিতিশীলতায় পৃথিবী নামক গ্রহণকে নষ্ট করারই অজ্ঞাত পরিকল্পনা আমরা করে চলেছি। এতে করে পৃথিবী নষ্টের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমরা শিশুদেরকে কোনোভাবেই সুন্দর পৃথিবী দিতে পারছি না বলে মনে হচ্ছে। কেননা শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন ন্যূনতম এক ঘণ্টা করে খেলাধুলা ও শারীরিক সক্রিয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থসংস্থার মতে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ন্যূনতম ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা, খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদি থাকা প্রয়োজন। সেই হিসেবে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্যে সোয়া দুই একর খোলা জায়গা এবং এক একর খেলার মাঠের প্রয়োজন। কিন্তু সেটা আমরা দিতেই পারছি না।

তাছাড়া আগে আমরা চিন্তা করতাম, একটি স্কুলে মানেই সম্মুখে খোলা মাঠ; আর সেই মাঠে শিশুরা হৈ চৈ করে দিন পার করছে। কিন্তু এখন একটি বাড়িই যেন একটি স্কুল। আগের সেই বিদ্যালয়ের সম্মুখে খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্যে বিশেষভাবে ডিজাইন করা খেলার মাঠ বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়। সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া প্রচারের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো আবাসন এলাকার ন্যূনতম ১০ ভাগ খেলার মাঠ-পার্ক প্রভৃতি বিনোদন সুবিধার জন্যে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। অতি ঘন নগর এলাকায় প্রতি আধা বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যা বিবেচনায় ন্যূনতম একটি খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন। খেলার মাঠ আমাদের সামাজিকীকরণ বাড়ায় ও উদার চিত্ত হৃদয়ের মানুষ গড়তে সহায়তা করে। সমাজকল্যাণ, মনোবিদ্যা এবং অপরাধ-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর-তরুণদের দ্বারা অপরাধের মাত্রার সঙ্গে খেলার মাঠের সুবিধা, পার্কের সংখ্যা, খোলা জায়গার পরিমাণ প্রভৃতির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক বিদ্যমান।

উন্নত বিশ্ব তথা ইউরোপ বা আমেরিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে তাদের পরিকল্পনার একটা বড় অংশ থাকে শিশুদের শিক্ষা, বিনোদন, খেলাধুলা ও সংস্ক…তিচর্চা নিয়ে। বিশ্বের যে দেশগুলো শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠের ওপর জোর দেয় তারা প্রায়শই শিশু কল্যাণ, শিক্ষা এবং উদ্ভাবনী নগর পরিকল্পনার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা এবং শিশুর বিকাশকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সংবেদনশীল এবং কল্পনাপ্রসূত খেলার জন্য প্রাক…তিক উপকরণ অন্তর্ভুক্ত করে তারা শিশুদের জন্য উপযোগী খেলার মাঠ তৈরি করে। তারা মনে করে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের নিজের জীবনে ঝুঁকি এড়াতে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে খেলার মাঠের বিকল্প নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সুপারকিলেন পার্ক (ডেনমার্ক), টিভোলি গার্ডেনস খেলার মাঠ (সুইডেন)।

খেলার মাঠ না থাকায় শিশু-কিশোররা খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের অজান্তেই সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল গেমসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়ছে। জাপানে শৈশবে স্থূলতার হার সবচেয়ে কম। এর পাশাপাশি, শিশুমৃত্যুর হার কম, বায়ু ও পানি দূষণের মাত্রাও (যা শিশুদের প্রভাবিত করে) কম। এটি যেকোনো পরিবারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে র্ট্যাফিক দুর্ঘটনা যেমন কম ঘটে, তেমনি যেকোনো দেশের তুলনায় জাপানে খুনের হার সবচেয়ে কম, প্রতি লাখে মাত্র দশমিক দু’জন মানুষ। সিঙ্গাপুর উদ্ভাবনী শহুরে নকশার সাথে শিক্ষাকে একীভ‚ত করার জন্য খেলার মাঠকে বিশেষ বিবেচনায় নেয়। শহুরে পার্কে থিমেটিক খেলার মাঠ, শারীরিক এবং জ্ঞানীয় চ্যালেঞ্জের সমন্বয় ঘটায়, যেমন বে চিলড্রেনস গার্ডেন।

এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই যে শিশু-কিশোরদের মধ্যে জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির বীজ লুকায়িত থাকে। তাদের প্রতি অবহেলা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুখ থুবড়ে পড়বে। খেলার মাঠ না থাকায় শিশু-কিশোররা খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের অজান্তেই সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল গেমসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়ছে। ইংল্যান্ডের পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টের গবেষণা থেকে জানা যায়, ‘যেসব শিশু কম্পিউটার, টেলিভিশন ও ভিডিও গেমস নিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকে, তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হীনম্মন্যতায় ভোগে। এসব শিশুরা অন্যদের সঙ্গে মিশতে চায় না বা ঠিকমতো পারে না। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলে না, নিজেদের দৈনন্দিন কাজগুলোও তারা করতে পারে না। অনেক সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারায় এদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়।’ শিশু-কিশোরদের অটিজম, মনোযোগ হ্রাস, হতাশা ও তীব্র বিষণœতায় আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে ভিডিও গেম আসক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

আমরা প্রায় সবাই শিশুদের মানসিক বিকাশের বিষয়ে সচেতন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র, শিশুর মানসিক বিকাশে অধিকভাবে দায়িত্বপালন করে থাকে। কীভাবে একটি শিশু তার মেধা, মনন ও মানসিকতায় বেড়ে উঠতে পারে সেই গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের অসংখ্য রাষ্ট্র শিশুদের জন্য খেলার মাঠ তৈরি করে চলেছে। যেসব দেশ মূলত খেলার মাঠ তৈরি করে চলেছে তারা বুঝতে পেরেছে যে একটি জাতি শিশুদের গুরুত্ব দেয়ার মধ্যদিয়ে কীভাবে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশে বেশিরভাগ বিদ্যালয়ের সামনে খোলা জায়গা না থাকায় কোমলমতি শিশুরা ছোটাছুটি করতে বা দৌড়াতেও পারে না। শিশুরা মা-বাবার হাত ধরে এসে ক্লাসরুমেই প্রবেশ করে এবং ক্লাসশেষে বাড়ি ফিরে যায়। বাংলাদেশে বেশিরভাগ বিদ্যালয়ের সামনে খোলা জায়গা না থাকায় কোমলমতি শিশুরা ছোটাছুটি করতে বা দৌড়াতেও পারে না। শিশুরা মা-বাবার হাত ধরে এসে ক্লাসরুমেই প্রবেশ করে এবং ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে যায়। শারীরিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মানসিক, সামাজিক, আবেগ বিকাশেও খেলাধুলার গুরুত্ব অনেক। খেলার মাধ্যমে শিশুর সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি, সামাজিক জ্ঞানবোধ, সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব এবং নেতৃত্বগুণ বিকশিত হয়। আমরা চাই-শিশুরা খেলুক, শিশুরা হাসুক, শিশুরা গড়ুক আগামী।

বৃহস্পতিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৫
২৫ পৌষ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

You might like