

মিজানুর রহমান রানা
প্রতিদিন সকালে সূর্য উঠে আর সন্ধ্যায় অস্তমিত হয়। মেঘ জমে বৃষ্টি হয়, কখনো আবার মেঘ জমে বৃষ্টি হয় না। চলে যায় দূরে কোথায়ও। আমাদের জীবনেও কিছু কিছু ঘটনা এমন ঘটে, আবার এ বাইরেও অনেক ঘটনা ঘটে যার কোনো অস্তিত্ব এক সময় পাওয়া যায় না। পৃথিবীজুড়ে কতশত ঘটনা ঘটে, কেউ বিশ্বাস করে আবার কেউ বিশ্বাসও করে না।

নাবিলা একজন চিত্রশিল্পী। তার স্টুডিওটা চট্টগ্রামের পাহাড়তলির এক পুরনো বাড়ির দোতলায়। প্রতিদিন সকালে সে সূর্যের আলোয় বসে রঙ মেশায়, ক্যানভাসে তুলির আঁচড় ফেলে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে, তার প্রতিটি ছবিতে একটা অদ্ভুত ছায়া দেখা যাচ্ছে, একটা অস্পষ্ট অবয়ব, যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে দূরে, তাকিয়ে আছে।
বিষয়টা অস্পষ্ট দেখে প্রথমে সে ভেবেছিল, এটা তার চোখের ভুল। অথবা এটা একটা ভ্রম। যা আসলেই ঘটেনি। তারপর সে ছবিগুলো আলাদা করে রাখে, আলো-ছায়া পরীক্ষা করে। কিন্তু ছায়াটা বদলায় না। বরং, প্রতিটি ছবিতে সেটা একটু একটু করে এগিয়ে আসে।
নাবিলার দাদার নাম মোহাম্মদ হাশেম আলী, যিনি এক সময় ছিলেন একজন বিখ্যাত একজন শিল্পী। যাকে সারা বাংলাদেশসহ অনেক রাষ্ট্রের মানুষই চিনতো তার চিত্রকর্মের কারণে। তার মৃত্যুর পর, নাবিলা পেয়েছিল তার পুরনো স্টুডিও আর কিছু অসমাপ্ত ছবি।
একদিন, পুরনো কাঠের বাক্স ঘাঁটতে গিয়ে সে পায় একটা মোড়ানো ক্যানভাস। খুলতেই দেখে একটা অর্ধেক আঁকা ছবি, যেখানে ছায়াটা স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়ার নিচে লেখা: “ছায়া সব জানে।” তার দাদা এই ছবিটা শেষ করেননি। মৃত্যুর আগের রাতে, তিনি হঠাৎ হৃদরোগে মারা যান।
নাবিলা ছবিটা নিয়ে বসে। সে ছায়ার গঠন, রঙ, ছায়ার দিক—সব বিশ্লেষণ করে। ছায়াটা যেন মানুষের মতো, কিন্তু মুখ নেই। সে ছবির নিচে আলোর নিচে রাখলে দেখে, ছায়ার ভেতরে যেন আরেকটা অবয়ব লুকিয়ে আছে, একটা হাত, যেটা কিছু ধরতে চায়।
নাবিলা সিদ্ধান্ত নেয়, সে ছায়াটাকে অনুসরণ করবে। সে প্রতিদিন একটা নতুন ছবি আঁকে, শুধু ছায়াটাকে কেন্দ্র করে। ছায়াটা বদলায়, কখনো দেয়ালের পাশে, কখনো জানালার নিচে, কখনো তার নিজের পেছনে।
নাবিলা তার মায়ের কাছে জানতে চায়, দাদার মৃত্যুর আগের দিন কী ঘটেছিল। তার মা বলেন, “তোমার দাদা শেষ ছবিটা আঁকার সময় খুব অস্থির ছিলেন। বারবার বলতেন, ‘ছায়া ফিরে এসেছে।”
নাবিলা জানতে পারে, তার দাদা একসময় এক অপরাধের সাক্ষী ছিলেন, এক শিল্প প্রদর্শনীতে এক শিল্পীকে হেয় করার জন্য তার ছবি নকল করে বিক্রি করা হয়েছিল। দাদা সেটা জানতেন, কিন্তু প্রকাশ করেননি। সেই শিল্পী পরে একসময় আত্মহত্যা করেন।
নাবিলা বুঝতে পারে, ছায়াটা শুধু প্রতীক নয়, এটা এক অপরাধের স্মৃতি। ছায়া তার দাদার অপরাধের সাক্ষী, আর এখন তার ছবিতে ফিরে এসেছে।
নাবিলা এক রাতে স্বপ্নে দেখে, ছায়াটা তার দিকে এগিয়ে আসছে, বলছে “তুমি যদি সত্য আঁকো, আমি চলে যাব।”
নাবিলা সিদ্ধান্ত নেয়, সে একটা ছবি আঁকবে যেখানে ছায়াটা থাকবে, কিন্তু এবার সে ছায়ার মুখ আঁকবে।
সে দাদার পুরনো চিঠি, ডায়েরি, আর সেই শিল্পীর আত্মহত্যার খবর সংগ্রহ করে। সব তথ্য একত্র করে সে একটা ছবি আঁকে ছায়ার মুখে যন্ত্রণা, চোখে অভিযোগ, আর পেছনে তার দাদার মুখ লজ্জায় মুখ ঢেকে রেখেছে। ছবিটার নাম দেয়: “অপরাধের ছায়া।”
ছবিটা আঁকার পর, নাবিলা দেখে তার পরবর্তী ছবিতে আর ছায়া আসে না। তার স্টুডিও শান্ত, রঙ স্বচ্ছ, আর ক্যানভাসে আলো ফিরে এসেছে। সে বুঝে যায়, ছায়া শুধু অভিশাপ ছিল না, সত্য প্রকাশের আহ্বান ছিল।
শেষ ছবিটা সে প্রদর্শনীতে রাখে, নিচে লেখে: “ছায়া সব জানে, কিন্তু আলোই মুক্তি দেয়।”
এ সময় দর্শকদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ এগিয়ে আসে। তার চোখে অদ্ভুত এক ঝলক, মুখে চাপা হাসি। তিনি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “ছবিটা সুন্দর হয়েছে। কিন্তু তুমি ছায়ার মুখ আঁকোনি, তুমি নিজের মুখ এঁকেছো।”
নাবিলা চমকে ওঠে। তারপর বৃদ্ধকে প্রশ্ন করে “আপনি কী বলতে চাইছেন?”
বৃদ্ধ বলেন, “তোমার দাদা শুধু একজন অপরাধের সাক্ষী ছিলেন না। তিনি সেই শিল্পীর কাজ নকল করেছিলেন। কিন্তু তার নির্দেশে কাজটা করেছিল কে জানো?”
নাবিলা কাঁপতে কাঁপতে বলে, “কে?”
বৃদ্ধ রহস্যময়ভাবে হাসেন। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “তুমি। তুমি তখন ছোট ছিলে, কিন্তু তোমার হাতেই প্রথমবার সেই শিল্পীর স্টাইল নকল করে একটা স্কেচ আঁকানো হয়েছিল। তোমার দাদা সেটা ব্যবহার করেছিলেন। তুমি নিজেই সেই ছায়ার জন্ম দিয়েছিলে।”
কথাগুলো শুনে নাবিলা স্তব্ধ হয়ে যায়। তার মনে পড়ে, একবার দাদা বলেছিলেন, “তুমি খুব ভালো আঁকো, এমন একটা স্টাইল আছে, যেটা আমি কাজে লাগাবো।”
ছায়া শুধু দাদার অপরাধের স্মৃতি নয়, তার নিজের শৈশবের ভুলের প্রতিচ্ছবি। ছায়া সব জানে, কারণ ছায়া তার ভেতরেই ছিল।
এ সময় এক যুবক এগিয়ে আসে। সে তার পরিচয় দেয়। তার নাম তুষার আহমেদ। সে বলে, “আপনার ওই ছবিটা আমি ক্রয় করতে চাই। কত টাকা দাম?”
হঠাৎ করেই নাবিলা দেখে, এতোক্ষণ যে বৃদ্ধের সাথে কথা বলছিলো সে আর নেই।
নাবিলা ভালো করেই চারদিকে তাকায়, নেই। হাওয়া হয়ে গেছে বৃদ্ধ।
নাবিলাকে ভাবতে দেখে তুষার প্রশ্ন করে, “আপনি কি ছবিটা বিক্রয় করবেন না?”
নাবিলা কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। নির্বাক তাকিয়ে থাকে তুষারের দিকে। তুষার নাবিলাকে বলে, “ছবিটা আমার বাবার মতো দেখতে। তিনি ছিলেন একজন শিল্পী, যিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। আমি সেই শিল্পীর ছেলে।”
“নাবিলা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। ছায়া নেই, কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা ছায়া নড়ে ওঠে। সে জানে, সত্য আঁকা শেষ হয়নি।”
শনিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২৪ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
শনিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২৪ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ












