

মিজানুর রহমান রানা :
সন্ধ্যা নামার আগেই রূপা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। জানালার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো তার মুখে পড়ে, যেন সময় নিজেই তাকে ছুঁয়ে দেখতে চায়। আজ তার জীবনের একটি বিশেষ দিন।

সে প্রথমবারের মতো তার মায়ের সবুজ-সোনালি পাড়ের শাড়িটি পরেছে। শাড়িটি শুধু কাপড় নয়, একটি উত্তরাধিকার। মায়ের বিয়ের সময়ের স্মৃতি, তার হাসি, তার চোখের জল সবই যেন এই শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে আছে।
রূপার ডান হাতে সবুজ চুড়ি, বাঁ হাতে একটি সোনালি আংটি। যা তার দাদী তাকে দিয়েছিলেন। সে চুল ঠিক করতে করতে আয়নায় নিজের দিকে তাকায়। চোখে একধরনের আত্মবিশ্বাস, কিন্তু তার গভীরে এক অজানা শঙ্কা। আজ সে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে, যেখানে সে তার নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করবে। একটি কবিতা যা নারীর আত্মপরিচয়, উত্তরাধিকার ও সৌন্দর্য নিয়ে।
শাড়ির পাড়ে সূক্ষ্ম নকশা, যেন সময়ের সূচিকর্ম। প্রতিটি সোনালি রেখা তার জীবনের গল্প বলে—একটি মেয়ের বেড়ে ওঠা, তার সংগ্রাম, তার স্বপ্ন। রূপা জানে, আজ সে শুধু একটি পোশাক পরেনি, সে একটি ইতিহাস ধারণ করেছে।
অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পর রূপা দেখে, চারপাশে আলো, শব্দ, মানুষের কোলাহল। কিন্তু তার ভেতরে একধরনের নিঃশব্দতা। সে জানে, আজকের কবিতা শুধু শব্দ নয়, এটি একটি আত্মপ্রকাশ।
মঞ্চে ওঠার আগে সে আয়নার দিকে তাকায়, যা সাজঘরের এক কোণে রাখা। তার চোখে জল নেই, কিন্তু হৃদয়ে একধরনের পূর্ণতা। সে জানে, আজ সে শুধু নিজের কথা বলবে না, সে বলবে তার মায়ের, দাদীর, এবং হাজারো রূপার কথা যারা শাড়ির ভাঁজে নিজেদের কথা লুকিয়ে রাখে।
মঞ্চে রূপার কণ্ঠে যখন শেষ পঙ্ক্তিটি ধ্বনিত হয় :
“আমি শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা গল্প,
আমি উত্তরাধিকার, আমি নিজস্বতা।”
তখন পুরো হল নিঃশব্দ। কেউ হাততালি দেয়নি, কেউ চিৎকার করেনি। শুধু একধরনের স্তব্ধতা, যেন শব্দের চেয়ে অনুভূতি বেশি জোরালো।
রূপা মঞ্চ থেকে নামার সময় তার চোখে জল নেই, কিন্তু হৃদয়ে একধরনের মুক্তি। সে জানে, আজ সে নিজেকে প্রকাশ করেছে। ভয়ের ঊর্ধ্বে, অতীতের ঊর্ধ্বে।
ঠিক তখনই, ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে আসে। সবুজ পাঞ্জাবি, চোখে একধরনের অচেনা চেনা ভাব। রূপা থমকে যায়।
“তুমি রূপা, তাই না?”
“আপনি?”
“আমি ইরফান। তোমার মায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। তোমার কবিতায় তার ছায়া দেখলাম।”
রূপা বিস্ময়ে তাকায়। মা কখনো ইরফানের কথা বলেনি।
ইরফান পকেট থেকে একটি পুরনো ছবি বের করেন। তাতে রূপার মা, সবুজ শাড়িতে, পাশে ইরফান।
“তোমার মা একসময় কবিতা লিখতেন। কিন্তু জীবন তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। আজ তুমি সেই থেমে যাওয়া কণ্ঠকে আবার জাগিয়ে তুলেছো।”
রূপা স্তব্ধ। তার মনে পড়ে, মা কখনো নিজের অতীত নিয়ে বেশি কথা বলতেন না। শুধু একবার বলেছিলেন, “শাড়ির ভাঁজে অনেক কথা থাকে, রূপা। সব বলা যায় না।”
ইরফান বলেন, “তোমার কবিতার নাম ‘উত্তরাধিকার’ তাই না?”
রূপা মাথা নাড়ে।
ইরফান হাসেন, “তোমার মা ঠিক এই নামেই একটি কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু কখনো প্রকাশ করেননি। আমি সেই পাণ্ডুলিপি এখনো রেখেছি।”
তিনি একটি পুরনো খামে ভাঁজ করা কাগজ বের করেন। রূপা কাঁপা হাতে তা নেয়। খামে লেখা “উত্তরাধিকার, ১৯৮৭”।
রূপা পড়ে
“আমি শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা গল্প,
আমি উত্তরাধিকার, আমি নিজস্বতা।”
—ঠিক সেই পঙ্ক্তি, যা সে আজ আবৃত্তি করেছে।
রূপা বুঝে যায়, তার কবিতা শুধু তার সৃষ্টি নয়, এটি একটি উত্তরাধিকার, একটি পুনর্জন্ম।
ইরফান বলেন, “তোমার মা চেয়েছিলেন, কেউ যেন তার কথা বলে। কিন্তু সাহস পাননি। তুমি সেই সাহস।”
রূপা চোখ মুছে বলেন, “আমি জানতাম না, আমি তার গল্প বলছি।”
ইরফান বলেন, “তুমি শুধু বলছো না, তুমি তাকে ফিরিয়ে এনেছো।”
রূপা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবার। এবার সে শুধু নিজেকে দেখছে না, সে দেখছে তার মাকে, দাদীকে, এবং সেইসব নারীদের যারা নিজেদের গল্প বলার সুযোগ পায়নি।
সে জানে, আজকের সন্ধ্যা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের সন্ধ্যা।
তার চোখে জল নেই। শুধু একধরনের দীপ্তি। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে উচ্চারণ করে “আমি শুধু একটি শাড়ি পরিনি, আমি একটি কণ্ঠস্বর ধারণ করেছি।”
–
মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট ২০২৫ খ্রি., ২৭ শ্রাবণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে
স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?
ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ
শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা
যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন
চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন












