প্রতীক্ষার শেষ বিকেল : ক্ষুদীরাম দাস

গল্প

বৃদ্ধাশ্রমের সেই লোহার গেটটা প্রতিদিন বিকেলবেলা কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ শব্দ করে খুলে যায়। কখনো কোনো নতুন মুখের আগমন হয়, আবার কখনো কারও সন্তান বা স্বজন ছুটির দিনে দেখা করতে আসে। গেটের এক কোণে, সাদা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ, আব্দুল করিম সাহেব, প্রতিদিন একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার চোখ দুটো সজল, কিন্তু সেখানে মিশে আছে এক অদ্ভুত আশাবাদ।

আশ্রমের কর্মীরা তাকে প্রায়ই বলেন, ্য়ঁড়ঃ;চাচা, ভেতরে চলেন, ঠান্ডা লেগে যাবে।্য়ঁড়ঃ; কিন্তু করিম সাহেব কেবল মৃদু হাসি দিয়ে বলেন, ্য়ঁড়ঃ;আরেকটু দাঁড়াই… হয়তো আজ আমার ছেলে আসবে।্য়ঁড়ঃ; তার একমাত্র ছেলে, সেলিম, বিদেশে থাকে। সে সেখানকার ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে এতটাই মিশে গেছে যে বাবার জন্য আলাদা করে সময় বের করা তার পক্ষে কঠিন।

প্রতি দুই-তিন মাসে হয়তো একবার ফোন আসে। সেই ফোনে কেবল দুটো কথা, ্য়ঁড়ঃ;আব্বা, ভালো আছো?্য়ঁড়ঃ; ্য়ঁড়ঃ;হ্যাঁ রে বাবা, ভালো আছি।্য়ঁড়ঃ; এর বেশি কিছু নয়। অথচ এইটুকু কথার ওপরে ভর করেই করিম সাহেব দিন গুনে চলেন। তিনি মনে মনে এক কল্পিত দৃশ্য আঁকেনÑহঠাৎ একদিন গেটটা সম্পূর্ণ খুলে যাবে, আর সেখান দিয়ে প্রবেশ করবে তার ছেলে সেলিম। সেলিম এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বলবে, ্য়ঁড়ঃ;চলো আব্বা, তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।্য়ঁড়ঃ; প্রতিদিন বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি সেই গেটের দিকে আটকে যায়। আশ্রমের অন্যান্য বৃদ্ধরা যখন দাবা খেলে, আড্ডা দেয় বা নামাজ পড়ে, তখনও তিনি গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার মনের ভেতরে বয়ে চলে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার নদী, যার কোনো ক‚ল নেই।

একদিন এক তরুণ কর্মী তার পাশে এসে দাঁড়াল। করিম সাহেবের বিষণœ চোখ দেখে তার কৌত‚হল হলো। মৃদু হেসে সে বলল, ্য়ঁড়ঃ;চাচা, যদি না-ই আসে ছেলে, তবে এত অপেক্ষা করে কী হবে?্য়ঁড়ঃ; করিম সাহেব চোখ মুছলেন। তার কণ্ঠে কোনো হতাশা ছিল না, ছিল গভীর এক জীবনবোধ। তিনি বললেন, ড়ঃ;বাবা, আমি জানি সে আসবে না। তবুও এই অপেক্ষা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। যদি অপেক্ষাই ছেড়ে দিই, তবে বাঁচার মানে থাকবে কোথায়?্য়ঁড়ঃ; সেই সন্ধ্যায় প্রবল ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। আকাশ কালো হয়ে গেল, যেন প্রকৃতিও তার দুঃখের সঙ্গী। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভিজছিলেন করিম সাহেব। কর্মীরা তাকে ভেতরে টানতে গেল, কিন্তু তিনি বললেন, ্য়ঁড়ঃ;ভয় পেয়ো না বাবা, হয়তো এই বৃষ্টিতেই সে আসবে।্য়ঁড়ঃ; কেউ এল না।

বৃষ্টি থেমে গেল। রাতের কালো আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে এল। গেটের সামনে তখনও একাকী দাঁড়িয়েছিলেন করিম সাহেব। তার শরীর ঠান্ডা হয়ে
গিয়েছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।

কয়েকদিন পর সকালবেলা কর্মীরা দেখল, করিম সাহেব গেটের সামনে সেই পুরোনো বেঞ্চে শুয়ে আছেন। তার চোখ দুটি চিরতরে বন্ধ, কিন্তু ঠোঁটে লেগে আছে ছোট্ট একটি হাসি। সেই হাসিতে যেন কারো আগমনের আনন্দ লুকিয়ে আছে। তার অপেক্ষা ফুরিয়েছিল। তিনি আর অপেক্ষা করলেন না।
হয়তো চলে গেলেন অন্য এক দরজায়Ñযেখানে কোনো অবহেলা নেই, কোনো একাকিত্ব নেই, শুধু চিরন্তন শান্তি।

বৃদ্ধাশ্রমের পালক মহোদয় গত ত্রিশ বছর ধরে এই ধরনের অসংখ্য দৃশ্য দেখেছেন। তিনি এই দুঃখময় পরিণতিগুলোর সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত যে তার চোখে আর জল
আসে না। তিনি শুধু প্রার্থণা করেন, যেন এমন অভিশপ্ত জীবনের দ্রæত মুক্তি হয়। এই সমাজে এমন অনেক আব্দুল করিম আছেন, যারা কেবল এক মুঠো ভালোবাসা আর সামান্য সময়ের প্রত্যাশায় দিন গুনে চলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সেই অপেক্ষার শেষ হয় জীবনের সমাপ্তিতে, কোনো আগমনের মধ্যে নয়।

শনিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৫

You might like