
একটি ছোট্ট শহরে, যেখানে চার্চের ঘণ্টাধ্বনি প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে, সেখানে থাকতেন পাস্টর জনাথন মিলার। তাঁর পরিবার ছিল শহরের আদর্শÑস্ত্রী মেরি, যিনি চার্চের সানডে স্কুলে শিক্ষা দিতেন, এবং তাঁদের একমাত্র কন্যা এলিজাবেথ, যাকে সবাই ডাকত লিজি। লিজি ছিল মাত্র পনেরো বছরের, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল পাহাড়ের মতো অটুট। প্রতি রবিবার সকালে, সে চার্চের গায়কদলের সঙ্গে গান গাইত, এবং তার কণ্ঠস্বর যেন স্বর্গের দূতের মতো শোনাত। জনাথন প্রায়ই বলতেন, “লিজি আমাদের ঈশ্বরের উপহার, তাঁর কৃপার প্রতীক।”
শহরের সমাজটি ছিল ঘনিষ্ঠ। চার্চের সদস্যরা একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশ নিত। মিসেস হ্যারিস, যিনি বয়স্কা বিধবা, লিজির সঙ্গে বাইবেল পড়তেন; আর মিস্টার থমাস, শহরের একমাত্র ডাক্তার, যিনি জনাথনের সঙ্গে প্রতি বৃহস্পতিবার বাইবেল অধ্যয়ন করতেন। এই সমাজে বিশ্বাস ছিল জীবনের ভিত্তিÑপ্রার্থনায় শক্তি, ক্ষমায় শান্তি, এবং প্রভুর ইচ্ছায় সবকিছুর সমাধান। কিন্তু বিশ্বাসের এই দুর্গে একদিন ফাটল ধরল, যা কেউ কল্পনাও করেনি।

এক শীতের সকালে, লিজি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হয়েছিল, কিন্তু দিন যত গড়াতে লাগল, তার শরীর দুর্বল হয়ে উঠল। ডাক্তার থমাস পরীক্ষা করে বললেন, “এটি একটি বিরল রোগ, লিউকেমিয়া। চিকিত্সা দরকার, কিন্তু সময় কম।” জনাথন এবং মেরি চার্চের সকলকে প্রার্থনার জন্য আহŸান করলেন। শহরের প্রতিটি ঘরে প্রার্থনার চক্র চললÑরাত জাগিয়ে, দিন কাটিয়ে। “প্রভু যিশু, তোমার কৃপায় লিজিকে সুস্থ করো,” এই ছিল সকলের মন্ত্র। লিজি নিজেও বিছানায় শুয়ে বলত, “বাবা, প্রভু আমাকে ছেড়ে যাবেন না। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হোক।”
কিন্তু দিনগুলো কেটে গেল, এবং লিজির অবস্থা আরও খারাপ হল। হাসপাতালের শয্যায় সে তার শেষ দিনগুলো কাটাল। জনাথন প্রতিদিন বাইবেল থেকে পড়তেন: “যিশু বললেন, ‘যে আমার উপর বিশ্বাস করে, সে মরিলেও জীবিত হইবে।'” কিন্তু যখন লিজির শেষ নিঃশ্বাস পড়ল, তখন জনাথনের বিশ্বাস যেন একটি ভঙ্গুর কাচের মতো চুরমার হয়ে গেল। “কেন, প্রভু? কেন আমার মেয়েকে নিলে?” তিনি চিৎকার করে উঠলেন, চার্চের বেদিতে দাঁড়িয়ে। মেরি নীরবে কাঁদতেন, তার হাতে লিজির ছোট্ট ক্রস-যুক্ত লকেট।
শহরের সমাজে এই ঘটনা যেন একটি ঝড় তুলল। মিসেস হ্যারিস বললেন, “এটি প্রভুর পরীক্ষা। আমরা দুর্বল হলে চলবে না।” কিন্তু মিস্টার থমাস, যিনি লিজির চিকিত্সা করেছিলেন, চুপচাপ বললেন, “বিজ্ঞান বলে এটি রোগ, কিন্তু বিশ্বাস কোথায় ছিল?” চার্চের সভায় ফিসফিসানি শুরু হল: কেউ বলল, “পাস্টরের পাপের ফল,” অন্যরা বলল, “প্রভুর ইচ্ছা বোঝা যায় না।” জনাথনের প্রসঙ্গে গুজব ছড়ালÑতিনি আর প্রচার করেন না, রাতে একা বসে থাকেন, বাইবেল খোলেন না। পরিবারটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল: মেরি চার্চ থেকে দূরে সরে গেলেন, তার বিশ্বাস যেন একটি শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ল।
একদিন, শহরের বাইরে থেকে একজন অচেনা যাত্রী এলেনÑফাদার মার্ক, যিনি অনেক দূরের একটি মিশনারি থেকে এসেছিলেন। তিনি জনাথনের সঙ্গে কথা বললেন। “বিশ্বাসের আঘাত সহজ নয়,” বললেন ফাদার মার্ক। “যিশু নিজেও ক্রুশে চিৎকার করেছিলেন, ‘আমার ঈশ্বর, কেন আমাকে ত্যাগ করেছ?’ কিন্তু তাঁর পুনরুত্থানে বিশ্বাস ফিরে এসেছিল। তোমার লিজি হয়তো তোমাকে শেখাচ্ছে যে, বিশ্বাস শুধু সুখের নয়, দুঃখেরও সঙ্গী।” জনাথন শুনলেন, কিন্তু তার চোখে অশ্রæ। “কিন্তু সমাজ? তারা আমাকে দেখে বিশ্বাস হারাচ্ছে,” বললেন তিনি।
ফাদার মার্ক বললেন, “সমাজ তোমার মতোই মানুষের সমন্বয়। তাদের দেখাও যে, আঘাতের পরও উঠে দাঁড়ানো যায়। লিজির স্মৃতিতে একটি প্রার্থনা গৃহ তৈরি করো, যেখানে দুঃখী মানুষরা আসবে।” ধীরে ধীরে, জনাথন ফিরে এলেন। তিনি চার্চে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমার বিশ্বাস ভেঙেছে, কিন্তু প্রভুর কৃপায় আবার গড়ে উঠছে। লিজির মৃত্যু আমাদের শেখায় যে, বিশ্বাস শুধু প্রার্থনায় নয়, একে অপরের সমর্থনে।” মেরি তার পাশে দাঁড়ালেন, এবং শহরের লোকেরা ধীরে ধীরে ফিরে এল। মিসেস হ্যারিস লিজির গানের বই দিয়ে একটি গায়কদল গড়লেন, এবং মিস্টার থমাস বললেন, “বিজ্ঞান এবং বিশ্বাস একসঙ্গে চলতে পারে।”
বিশ্বাসের আঘাত যেন একটি অন্ধকার রাত্রি, কিন্তু ভোরের আলোয় তা নতুন আকার নেয়। জনাথনের পরিবার এবং শহরের সমাজ শিখল যে, গুরুতর আঘাতের পরও বিশ্বাস ফিরে আসেÑনা শুধু প্রভুর কৃপায়, বরং মানুষের মধ্যেকার বন্ধনে। লিজির কবরে লেখা রইল: “যে বিশ্বাস করে, সে চিরজীবী।”
রোববার, ০৫ অক্টোবর ২০২৫














