

ক্ষুদীরাম দাস
এক.
বড় কাকার ঘরে আমরা ভাই বোন রা খুব একটা যাই না। তবে যদি বলি যাই না, তাহলে সেটা একেবারে ভুল হবে। অর্থাৎ একান্তই প্রয়োজন না হলে আমরা কেউই তার ঘরে যাই না। কোনো প্রয়োজন না হলে তার ঘরে যাওয়া নিষেধ। আর যদি কখনো যাওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে অনুমতি নিয়েই তার ঘরে যেতে হয়। অসম্ভব রাগী; তাই কাকাকে কেউ পছন্দও করে না। ছোট বেলায় কাকে যেমন দেখে আসছি, এখনো সে রকমই আছে। কোনো পরিবর্তন দেখছি না। আর পরিবর্তন হবে বলে মনেও হয় না। আর এই কাকা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেন। এরপর নাস্তা খেয়ে হাঁটাহাঁটি করেন। মন যদি চায় তো নিজের বাগানের একটু পরিচর্যা করেন। আর বাগানের নতুন ফুল ফোটার জন্যে দারুণভাবে অপেক্ষা করেন।
মাঝে মাঝে এই কাকা বলে থাকেন, বাগানের চারপাশে ঘুরলে মনের পাথর সরে যায়, মন খুব নরম হয়। এসব কাকার মুখ থেকে শুনে সকলে মুখ লুকিয়ে হাসাহাসি করে। আমরা আশ্চর্য হতাম। কেননা কাকা যেমন প্রচণ্ড রাগী, তার মুখে এসব কথা কী করে মানায়? কাকাকে সকলেই খুবই সম্মানের চোখে দেখে, আবার ভয়ও পায় তেমন রকম।

একবার আমার ছেলে মেথিউ কাকার ঘরে ঢুকে খেলতে খেলতে বইয়ের তাকে পানি ঢেলে দিলো। সেই সাথে বাটিতে ভরে কাদামাটি নিয়ে নিজের মাথায় মেখেছে আর বইগুলোতে মেখে দিয়েছে। আহা সে কী কাÐ! আমরা তো হতবাক হলাম। পানি আর কাদা মাটিতে বইগুলোর সুন্দর প্রচ্ছদ একাকার হয়ে গেলো। এটা দেখে আমার বউ আচ্ছামতো করে হাতের কাছে থাকা লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগলো। আর মেথিউ বলতে লাগলো, ‘আমি কিছু বুঝি না, আমি কিছু বুঝি না।’ এই বলে কান্নাকাটি করতে লাগলো।
বিকেল বেকলা কাকা কোথা থেকে এসে হুট করে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বেশ কিছু সময় পর দরজাটা খুলে আমাকে ডাকতে শুরু করলেন।
খুব গম্ভীর ডাক শুনে ভয়ে ভয়ে তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বুঝতে পারলাম, আজ একটা কিছু ঘটে যাবে। বললেন, এসব কী হয়েছে আমার ঘরে?
‘মেথিউ করেছে, সে খেলতে খেলতে পানি আর কাদা মাটি ঢেলে দিয়েছে। লাবনী মেথিউকে অনেক মেরেছে যাতে সে আর কোনোদিন তোমার কোনো ক্ষতি না করে। সে আর তোমার ঘরে আসবে না বলেছে।
‘মেথিউকে মেরেছে কেন? সে তো ছোট মানুষ, অবুঝ, তাকে এভাবে মারলো কেনো?’
এভাবে কথা শুনে আমি তো হতবাক হলাম। এ যেন উল্টো রিএকশন। এটা তো আশা করিনি কাকার মুখ থেকে। আমি তো চুপ হয়ে গেলাম।
আমি চলে এলাম। পরে শুনলাম, এমন রাগী কাকা সেদিন লাবনীকে ধমকালেন, খুব রাগত স্বরে বকাবকি করে বলেন দিলেন তার ছেলেকে এমন নির্মমভাবে মারার জন্যে। পরে ঠাÐা স্বরে বলেও দিলেন, মেথিউ খুবই ছোট মানুষ, অবুঝ-তার জন্যে আমার ঘর মোটেও নিষিদ্ধ নয়। আমি একা মানুষ একটু পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, তাই বলে পানি ফেলেছে বলেই তাকে এভাবে মারধর করতে পার না। এটা খুবই অন্যায়!
আমি দূর থেকে কথাগুলো শুনছিলাম। আর হতবাক হচ্ছিলাম। তার মুখ থেকে এ রকম কথা আগে কখনো শুনিনি।
কাকা লাবনীকে বললো, মেথিউ’র বাবাকে একবার ডেকে দিও। আর তাকে বলে দিও, দিনের বেলা বেশি ঘুমাতে নেই। একটু থেমে আবার বললেন, তুমি আমার জন্যে একটা আদা -চা নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসো।
মনে হলো সেদিনের পর থেকেই কাকার বিধি নিষেধ অনেক কমে গেছে। এই কাকা রাগী হলেও আমাদের পরিবারের পরিচালনার দায়িত্ব তারই হাতে। আর তিনিই অভিভাবক হিসেবে এই সংসার আগলে রেখেছেন ত্রিশ বছর ধরে। তার সুশৃঙ্খল আর পরিপাটি পদচিহ্ন আমাদের জীবনকে দিয়েছে অনেক; কিন্তু এই মানুষটিই ক্যান্সারে আক্রান্ত সাত মাস ধরে! কি যে কষ্ট আর ভোগান্তি তাঁর আজ। যার গড়া বাগানে আমরা সপ্ন দেখে বড় হয়েছি, সে বাগানের মালিক আজ মৃত্যুর দুয়ারে। কেন জানি কাকা বিয়ে করেননি; যা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারিনি। কাকা অষ্টম শ্রেণীর পাসের পর তার এক বন্ধু তাকে নিয়ে বিদেশ গেলেন। সেখানে দিনরাত পরিশ্রমের ফসল আজকের এই আমাদের অবস্থান। এক টাকার জন্যে যেন কারো কাছে হাত পাতা না লাগে সেই ব্যবস্থা করেছেন এই কাকা।
দুই.
একদিন কাকা তার এক বন্ধুকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেদিন তার জন্মদিন ছিলো। তাই অনেকটা শখ করেই জমকালো জন্মদিনের আয়োজন করেছিলেন। গত কয়েক বছর আগেও এলাকার সকলকে এই দিনে আমন্ত্রণ দিয়ে খাইয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এমন জন্মদিনেও কাকাকে আনন্দে থাকতে দেখিনি। কোথায় যেন তার কষ্ট লুকিয়ে ছিলো। মানুষের জীবনে যদি এমন হয়, হয়তো সেজন্যেই মানুষের মুখে হাসি দেখা যায় না। তবে আমাদের পাশের প্রতিবেশীর বাড়ির নিলু কাকীকে অনেক এতোটাই উৎফুল্ল দেখি যেন, তার আনন্দের শেষ নেই। মনে হয়, তার কোনো সমস্যাই নেই। অথচ, লাখ লাখ টাকা মানুষের কাছে ঋণী হয়ে বসে আছেন। এটা হলো কলিজা, কলিজা লাগে এভাবে আনন্দে থাকতে হলে। আর আমার এই কাকা ক্যান্সার নামক মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত। এটা কেউ জানে না, কাউকে তিনি জানতে দেননি।
বিকেলের দিকে কাকাকে সাহস করে বলেই ফেললাম, কাকা আপনার স্পেশাল গেস্ট ত দেখি এখনো আসেনি?
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আরে বোকা আসবে, অবশ্যই আসবে। কথা দিয়েছে আসবে।
একটু পর আবার গিয়ে বললাম, তিনটা তো বেজে গেলো প্রায়। একবার ফোনে চেষ্টা করবো নাকি?
কাকা বললেন, আমি চেষ্টা করেছি কয়েকবার। তিনি হয়তো বিমানে রয়েছেন, তাই ফোন বন্ধ হয়তো।
এভাবে সন্ধ্যা হয়ে গেলো, যাকে ঘিরে এতো সব আয়োজন সে আসেনি। কাকা সেদিন মনে খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। আশা করেছিলাম, বন্ধু আসলো হয়তো কাকার মুখে হাসি দেখতে পাবো, তাঁর মুখে হাসি দেখিনি কতদিন হলো!
তিন.
সেদিন রাত প্রায় ৩টা বাজে। এতো গরমে ঘুম আসছিলো না। তাই কাকাকে নিয়ে হাসনাহেনা গাছের নিচে চেয়ারে বসে আছি। কাকা একটার পর একটা পান খেয়েই যাচ্ছেন; কিন্তু কিছু বলার মতো দুঃসাহস ছিলো না আমার; চুপচাপ দু’জনই।
আমার কাঁধে হাত রেখে কাকাই প্রথম কথা বললেন, বাবা, তোমার অনার্স শেষ হতে আর কত বছর বাকি আছে?
-আর দেড় বছর বাকি আছে।
-অনার্স শেষ হলে আমার ছোট বেলার বন্ধু কামালকে ফোন করবি। সে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব। সে আমার ছোট বেলার বন্ধু।আমার ডায়রিতে তার ফোন নম্বর আছে। সে তোর জন্যে একটা ভালো চাকুরির ব্যবস্থা করে দেবে।
কাকার কথা শুনে আমি হতবাক হলাম। কারণ, এটাতো কাকা নিজেই ফোন করে আমার জন্যে ব্যবস্থা করতে পারতেন। আমাকে এভাবে বলবার অর্থটা কী?
কাকা আবার বললেন, তোর মেধার কারণে তুই অবশ্যই চাকুরি পাবি। আর এই মোটর সাইকেলের চাবি, রেখে দে তোর কাছে। আজ থেকে এটা তোর। আর এই এসব সমস্ত কিছুর মালিক তুই।
কাকা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যংক একাউন্ট, তাঁর জমি-জামা, ঘর-বাড়ি আমাকে উপহার দিয়ে যান। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
আমার তখন হাত পা কাঁপছিলো অজানা কোনো কারণে।
কাকা আবার বললেন, আর এই যে হাস্নাহেনা (মাথা উচিয়ে দেখিয়ে) গাছটির নিচেই আমাকে কবর দিবি! কাকাকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি। তিনি কাঁদছেন আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি আর কান্না থামিয়ে রাখতে পারিনি। কাকাকে জড়িয়ে ধরলাম। তিনিও আমাকে জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন, একদম চিন্তা করবি না। আমি মরে গেলেও তোরা নিরাপদ থাকবি, ঈশ^র আমাকে অনেক দিয়েছেন।
চার,
খুব ভোর বেলা। কাকার ঘর থেকে কান্না শুনতে পেলাম। বুঝতে পারলাম, কাকা ওপারে চলে গেলেন। আমি বিছানা থেকে উঠতে পারছিলাম না। সবই আছে আগের মত কিন্তু একটি শুন্যতা আমাদের চারপাশ ঘিরে। যার বৃত্তের মাঝে আমাদের পথচলা ছিল সে রাগী মানুষটির জন্য পরিবারের সবার মত আমারও মনে কেঁদে উঠে এখনো !
কাকা মারা গেলেন অনেকদিন হয়ে গেলো।
সেদিন রাতের আকাশটা পরিস্কার ছিলো। চাঁদ তর সমস্ত আলো পৃথিবীতে ঢেলে দিচ্ছিলো। তাই চারিদিক এতোটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছিলো। আমি সারাদিন সেই হাসনা হেনা গাছের নিচে চেয়ারে বসে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। এভাবে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টেরও পাইনি। খুব ভোর বেলা ঘুমটা ভাঙ্গলে গাড়ির হর্ন শুনে।
গেইটের কাছে পাজেরো গাড়ির হর্ন বাজছে। আমি দারোয়ানকে ডেকে বললাম, গেইট খুলে দিতে। ভাবলাম, আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজন বিদেশ থেকে এসেছে কাকার মৃত্যুর খবর শুনে। দেখলাম, গাড়ির ভেতর থেকে এক সুন্দরী রমনী একটি ফুটফুটে মেয়ে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। পরে আরেকজন সুদর্শন পুরুষ। দু’জনের চোখে সবুজ ফ্রেমের কালো চশমা। আমার আর চিনতে অসুবিধা হয়নি। কাকার ডায়েরিটা পড়ে সব জানতে পেরেছি এবং তাঁর কয়েকটি বাধাই করা ছবিও দেখেছি। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, আসেন কাকী! আসেন কাকা!
তাদের নিয়ে কাকার ঘরে নিয়ে গেলাম। ঘরের চারপাশে তারা কী যেন খুঁজছেন।
মনে হচ্ছে কাঁদছিলেন কিন্তু চশমার জন্য বুঝা যায়নি। কাকার মৃত্যুর কথা শুনে বিদেশ থেকে সোজা আমাদের বাড়ি। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাকে তাঁর কবরের কাছে নিয়ে চলো!
আমি বললাম, আপনারা ফ্রেশ হয়ে নিন। অনেক দুর থেকে জার্নি করে এসেছেন।
-না, ফ্রেশ হওয়া লাগবে না তুমি নিয়ে চল।
-ঠিক আছে চলেন। কাকার কবরের সামনে তারা দাঁড়িয়ে আছেন। চশমা খুলে আমার দিকে একবার তাকালেন। তাদের তাঁর চোখ অসম্ভব লাল হয়ে গেছে। গাড়ি থেকে একগুচ্ছ গোলাপ ফুল এনে কাকার কবরের উপর রাখলেন।
কবর থেকে এসে তিনি আমাকে বললেন, তোমার কাকা আমাদের পরিবারের অনেক বড় উপকার করেছিলেন। তিনি আমাদের আপন ছিলেন। আমরা তোমার কাকার সেই উপকারের কথা কোনোদিন ভুলবো না।
আমি হতবাক হলাম। কিন্তু উপকারটা কী ছিলো সেটা কোনোদিন কাকাও আমাকে বলেননি, তারাও কোনোদিন বলেননি; আর আমিও কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি।
যতক্ষণ তারা আমাদের বাড়ি ছিলেন, ততক্ষণ তারা কাকার কথাই বেশি বলছিলেন। বিকেলে বললেন, আমরা থাকতে পারবো না রুমন! আমাদের আবার বিদেশ ফিরে যেতে হবে। তারা চলে গেলেন, আর আমি আরেকবার কাকার কবরের দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেলাম।
– সমাপ্ত-










