
ক্ষুদীরাম দাস :
শহরের হৃদয়ে, যেখানে আকাশচুম্বী ভবনগুলো যেন মানুষের স্বপ্নকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে রাহুলের জীবন ছিল এক অবিরাম দৌড়। রাহুল, একটি বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যার দিন শুরু হতো কফির কাপ হাতে কম্পিউটারের স্ক্রিনে, আর শেষ হতো রাতের গভীরে ফোনের আলোয়। তার চোখে স্বপ্ন ছিল অর্থের, ক্ষমতার, আর সেই প্রতিযোগিতার যেখানে প্রত্যেকটা মানুষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়াই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। “সময় নেই, ভাই,” সে বলতো তার সহকর্মীদের, যখন কেউ তার কাছে সাহায্য চাইতো। তার অ্যাপার্টমেন্টে, যেটা ছিল একটা উঁচু ভবনের দশতলায়, সে একা থাকতো। প্রতিবেশীরা? তারা ছিল শুধু দরজার ওপারের ছায়া, যাদের নামও সে জানতো না।

একদিন সকালে, রাহুলের ফ্ল্যাটের পাশের দরজা থেকে একটা কাতরানির শব্দ ভেসে এলো। সে তখন তার ল্যাপটপে একটা প্রেজেন্টেশন তৈরি করছিল, যেটা তার প্রমোশনের চাবিকাঠি। শব্দটা শুনে সে থামলো না। “বুড়ো মানুষের সমস্যা,” সে ভাবলো, আর তার মনে পড়লো তার প্রতিবেশী মিসেস গুপ্তার কথা। এক বৃদ্ধা, যিনি একা থাকেন, তার ছেলে বিদেশে। কয়েকবার লিফটে দেখা হয়েছে, কিন্তু কথা? না, কখনো না। সেই শব্দটা আবার এলো, এবার আরও জোরে। রাহুল বিরক্ত হয়ে উঠলো। তার মিটিং ছিল দশটায়, আর এখন নয়টা বাজে। কিন্তু শব্দটা থামলো না। অগত্যা সে দরজা খুলে বাইরে এলো।
মিসেস গুপ্তা মেঝেয় পড়ে ছিলেন, তার হাতে একটা ভাঙা কাচের গøাস, আর তার পায়ে রক্ত। “সাহায্য করো, বাবা,” তিনি কাঁপা গলায় বললেন। রাহুলের মন বললো, “অ্যাম্বুলেন্স ডাকো, আর চলে যাও।” কিন্তু তার চোখ পড়লো বৃদ্ধার চোখে – সেখানে ছিল এক অসহায়তা, যা তার নিজের জীবনের কোনো অংশ ছিল না। সে ঝুঁকে তাকে তুললো, তার হাতে রক্ত লেগে গেলো। “আমি নিয়ে যাচ্ছি হাসপাতালে,” সে বললো, আর নিজেকে অবাক করে দিলো। তার গাড়িতে করে তিনি হাসপাতালে গেলেন। ডাক্তার বললেন, “ভালো যে সময়মতো এনেছেন, না হলে ইনফেকশন হয়ে যেতো।”
হাসপাতাল থেকে ফিরে রাহুলের মন অস্থির হয়ে উঠলো। তার মিটিং মিস হয়েছে, বসের ফোন এসেছে দু’বার। কিন্তু মিসেস গুপ্তার ফ্ল্যাটে যখন সে তাকে শুইয়ে দিলো, তখন বৃদ্ধা বললেন, “তুমি আমার ছেলের মতো। কতদিন কেউ আমার সঙ্গে কথা বলেনি।” সেই কথাটা রাহুলের হৃদয়ে একটা ফাটল তৈরি করলো। সে তার নিজের জীবনের দিকে তাকালো – তার বাবা-মা গ্রামে, যাদের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। তার বন্ধুরা? তারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক দেয়। সেই রাতে সে ঘুমাতে পারলো না। তার মনে পড়লো ছোটবেলার গ্রাম, যেখানে প্রতিবেশীরা একে অপরের জন্য দাঁড়াতো। কিন্তু শহরে এসে সে সব ভুলে গেছে।
পরের দিন রাহুল অফিসে গেলো, কিন্তু তার মন ছিল অন্যত্র। তার সহকর্মী অর্জুন, যে তার প্রতিযোগী ছিল, তাকে দেখে বললো, “কী হয়েছে? প্রমোশনের চান্স হারিয়ে গেলো?” রাহুল হাসলো, “না, কিছু না।” কিন্তু অফিসের পর সে মিসেস গুপ্তার ফ্ল্যাটে গেলো। তিনি তাকে চা দিলেন, আর কথা বলতে শুরু করলেন। তাদের জীবনের গল্প। মিসেস গুপ্তার স্বামী মারা গেছেন দশ বছর আগে, ছেলে আমেরিকায়, যে মাসে একবার ফোন করে। “মানুষ এখন সময় নেই বলে সব ভুলে যায়,” তিনি বললেন। রাহুলের মনে পড়লো তার নিজের মা, যিনি তার জন্মদিনে ফোন করেছিলেন, কিন্তু সে বলেছিল, “ব্যস্ত আছি।” সেই সন্ধ্যায় সে তার মাকে ফোন করলো, ঘণ্টাখানেক কথা বললো। তার মায়ের গলায় আনন্দের ধ্বনি শুনে তার চোখ ভিজে এলো।
দিন যেতে থাকলো, রাহুলের জীবন পরিবর্তন হতে শুরু করলো। সে অফিসে তার সহকর্মীদের সাহায্য করতে লাগলো। অর্জুন, যে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতো, তাকে একটা প্রোজেক্টে সাহায্য করলো। “কেন করছিস?” অর্জুন জিজ্ঞাসা করলো। “কারণ আমরা একসঙ্গে কাজ করি, ভাই,” রাহুল বললো। অর্জুন অবাক হলো, কিন্তু পরে সে নিজেও পরিবর্তিত হলো। অফিসে একটা নতুন পরিবেশ তৈরি হলো – সহযোগিতার। রাহুলের বস লক্ষ্য করলেন, আর তার প্রমোশন হলো, কিন্তু এবার সেটা তার জন্য শুধু অর্থ নয়, সন্তুষ্টির।
কিন্তু সমাজের নিষ্ঠুরতা এত সহজে যায় না। একদিন রাহুলের অ্যাপার্টমেন্টে একটা ঘটনা ঘটলো। নিচতলার একটা ফ্যামিলি, যারা অভাবী, তাদের ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাক্তারের ফি নেই, ওষুধ কেনার টাকা নেই। প্রতিবেশীরা জানলো, কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না। “আমাদের নিজের সমস্যা আছে,” বলে সবাই উদাসীন। রাহুল শুনলো, আর তার মনে পড়লো মিসেস গুপ্তার কথা। সে গেলো তাদের ফ্ল্যাটে। বাবা-মা অবাক হয়ে তাকালেন। “আমি সাহায্য করবো,” সে বললো। সে তার কিছু সঞ্চয় থেকে টাকা দিলো, আর হাসপাতালে নিয়ে গেলো। ছেলেটা সুস্থ হলো। সেই খবর ছড়িয়ে পড়লো অ্যাপার্টমেন্টে। কেউ কেউ হাসলো, “পাগল হয়ে গেছে।” কিন্তু কয়েকজন এগিয়ে এলো। একজন বললো, “আমিও সাহায্য করতে চাই।” ধীরে ধীরে একটা গ্রæপ তৈরি হলো – প্রতিবেশীদের সাহায্যের জন্য।
রাহুলের জীবনে আরেকটা পরিবর্তন এলো যখন তার ছোটবেলার বন্ধু রাজু শহরে এলো। রাজু গ্রাম থেকে এসেছে চাকরির খোঁজে, কিন্তু কোনো জায়গা নেই। রাহুল তাকে তার ফ্ল্যাটে থাকতে দিলো। “তুই তো বদলে গেছিস,” রাজু বললো। “আগে তো বলতিস, ‘নিজের জন্য বাঁচ’।” রাহুল হাসলো, “সেই বাঁচাটা ছিল মৃত্যু। এখন বাঁচছি সত্যিকারের।” রাজুকে সে তার কোম্পানিতে চাকরি দিলো, না প্রতিযোগিতার ভয়ে, বরং ভ্রাতৃত্বের জন্য।
কিন্তু জীবনের পরীক্ষা থামে না। একদিন রাহুলের কোম্পানিতে একটা ক্রাইসিস এলো। একটা বড় প্রোজেক্ট ফেল হয়ে যাচ্ছিল, আর দোষ পড়লো অর্জুনের ওপর। বস বললেন, “তাকে ফায়ার করো।” রাহুল জানতো, অর্জুনের ফ্যামিলি নির্ভর করে তার ওপর। সে বললো, “না, স্যার। এটা আমাদের সবার দোষ। আমরা একসঙ্গে ঠিক করবো।” বস রাগলেন, কিন্তু রাহুল দাঁড়িয়ে রইলো। শেষমেশ প্রোজেক্ট ঠিক হলো, অর্জুন বেঁচে গেলো। “তুই কেন করলি?” অর্জুন জিজ্ঞাসা করলো। “কারণ তুই আমার ভাইয়ের মতো,” রাহুল বললো। সেই ঘটনা থেকে অফিসে একটা নতুন বন্ধন তৈরি হলো – সহমর্মিতার।
শহরের বাইরে, রাহুল তার বাবা-মাকে নিয়ে এলো তার ফ্ল্যাটে। তার মা বললেন, “বাবা, তুই তো বদলে গেছিস।” রাহুল হাসলো, “না মা, আমি ফিরে এসেছি নিজের কাছে।” সে একটা কমিউনিটি গ্রæপ তৈরি করলো, যেখানে প্রতিবেশীরা একে অপরের সাহায্য করে। মিসেস গুপ্তা হলেন সেই গ্রæপের মা-সমতুল্য। তার ছেলে ফিরে এলো, যখন শুনলো তার মায়ের নতুন জীবনের কথা। “তুমি আমাকে শিখিয়েছো, বাবা,” ছেলে বললো রাহুলকে।
একদিন রাহুল ছাদে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকালো। আকাশচুম্বী ভবনগুলো এখনও দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার চোখে সেগুলো আর স্বপ্নের প্রতীক নয়, বরং মানুষের একাকিত্বের। কিন্তু তার চারপাশে এখন মানুষ – প্রতিবেশী, বন্ধু, ফ্যামিলি। সে ভাবলো, সমাজের নিষ্ঠুরতা হয়তো থাকবে, কিন্তু একটা ছোট আলো জ্বালিয়ে যাওয়া যায়। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, মানবতার আলো, সহমর্মিতার চর্চা – এগুলোই সমাজকে বাঁচিয়ে রাখবে।
রাহুলের গল্প শেষ হয় না, কারণ এটা শুরু মাত্র। শহরের প্রত্যেকটা কোণে এমন গল্প ছড়িয়ে পড়–ক, যাতে নিষ্ঠুরতা হারিয়ে যায়, আর শান্তি ফিরে আসে।
শনিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৫














