
ক্ষুদীরাম দাস :
একসময় রফিক সাহেব ছিলেন এই সংসারের বটবৃক্ষ। তাঁর হাত দুটির স্পর্শে যেন সোনা ফলত। দিন-রাত পরিশ্রম করে তিনি শুধু পরিবারের মুখে হাসিই ফোটাননি, সংসারের বিরাট অংশের ব্যয়ভারও হাসিমুখে বহন করতেন। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজনÑসবার কাছে তাঁর ছিল অফুরন্ত কদর, সমাদর, সম্মান ও গুরুত্ব। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ আর উদার মনভাবের জন্য সবাই তাঁকে সমীহ করত। স্ত্রী, দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে তাঁর ছিল সুখী সংসার।

কিন্তু ভাগ্যবিধাতার খেলা বোঝা বড় দায়। বছর দুয়েক আগের এক দুর্ঘটনায় রফিক সাহেবের ডান হাতটি গুরুতর আঘাত পায়। অনেক চিকিৎসা করেও হাতটি সম্পূর্ণ অবশ হয়ে যায়। সেই হাতের জোর, সেই হাতের রোজগারÑসব যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।
শুরু হলো তাঁর জীবনের এক নতুন, কষ্টকর অধ্যায়।
প্রথম প্রথম সবাই দেখাল সহানুভ‚তি। কিন্তু মাস যেতে না যেতেই সেই সহানুভ‚তি ¤øান হতে শুরু করল। রফিক সাহেব কোনো কাজ করতে পারেন না, সংসারের টাকা দিতে পারেন না। এই একটি ‘না’-ই যেন তাঁর জীবনের সব ‘হ্যাঁ’ গুলোকে মুছে দিল।
যে স্ত্রী একসময় তাঁকে ছাড়া এক পা চলতেন না, তিনি এখন দীর্ঘশ্বাসের সুরে বলেন, “অসুস্থ তো আমি নই, অথচ সারাদিন তাঁর পিছনেই থাকতে হয়।” যে ছেলেরা বাবার সাফল্যে গর্ব করত, তারা এখন বিরক্তি নিয়ে চলাফেরা করে। আর মেয়ের মুখেও লেগে থাকে এক চাপা উদাসীনতা।
সংসারে রফিক সাহেবের গুরুত্ব আর নাই। তিনি যেন এখন অপ্রয়োজনীয় একটি আসবাব। বসার ঘরে চুপচাপ বসে থাকলে কেউ কোনো কথা বলে না, যেন তিনি অদৃশ্য। সামান্য ভুলে এখন বকা শুনতে হয়। কোনো কোনো সময় তাঁকে উদ্দেশ্য করে খারাপ আচরণও করা হয়, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। “বসে বসে শুধু খাচ্ছেন,”Ñএমন টিপ্পনি শুনতে হয় প্রায়ই।
এই অবহেলা রফিক সাহেবকে দারুণভাবে কষ্ট দেয়। তিনি মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। রাতে নীরবে বালিশে মুখ গুঁজে কান্নাকাটি করেন। তাঁর মনে হয়, পরিশ্রম করে তিনি যা দিয়েছেন, তার কি কোনো মূল্যই ছিল না? নাকি মানুষের ভালোবাসা শুধু অর্থের মাপকাঠিতে মাপা হয়?
তিনি আজ দয়ার পাত্রÑপরিবারের সকলের ভালোবাসা কমে গেছে। এই নির্মম সত্য তাঁকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়।
একদিন রাতে, ছোট ছেলে অভি বাইরে বন্ধুদের সাথে উচ্চস্বরে হাসাহাসি করছে, আর রফিক সাহেব ঘরের কোণে শুয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎই তাঁর মনে হলো, একটা সময় ছিল যখন এই হাসিটা তাঁর উপার্জনের কারণেই সম্ভব হতো। চোখ ফেটে জল এলো।
পরের দিন সকালে, স্ত্রী যখন বাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন, রফিক সাহেব দ্বিধা নিয়ে বললেন, “আজ মাংসটা একটু কম নিও, আমার জন্য তো আলাদা করে কোনো দরকার নেই…”
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই অভি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, “বাবা, কী বলছো এসব? তুমি অসুস্থ হলেও আমাদের পরিবারেরই অংশ। আমরা কি তোমাকে দেখে রাখব না? আমার তো এখন একটা চাকরি হয়েছে, সংসারের দায়িত্ব তো আমারও। আর মা, বাবার প্রতি এমন উদাসীনতা দেখালে হবে না। পারিবারিক দায়িত্ব শুধু টাকা রোজগারেই শেষ হয়ে যায় না, বরং মানবিকতা আর ভালোবাসা দিয়ে অসুস্থ বা অক্ষম সদস্যের পাশে থাকাই হলো আসল দায়িত্ব।”
অভির এই কথাগুলো যেন একটা শীতল জলের ধারা নিয়ে এলো। রফিক সাহেবের চোখে জল, তবে এবার কষ্টের নয়, আশার।
স্ত্রী আর অন্য সন্তানেরা যেন হতচকিত হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, তারা এত দিন কত বড় ভুল করছিল। রফিক সাহেবকে তাঁর শারীরিক অক্ষমতার জন্য দূরে ঠেলে দেওয়াটা মানবিকতার চরম অভাব। পরিবারের একজন সদস্য যখন দুর্বল, তখনই তার প্রতি ভালোবাসা ও সমাদর আরও বেশি করে দেওয়া উচিতÑএটাই হলো পারিবারিক বন্ধন।
সেই দিন থেকে রফিক সাহেবের প্রতি অবহেলা ধীরে ধীরে কমতে লাগল। তিনি আবার সবার মনোযোগ, যতœ ও সহানুভ‚তি পেতে শুরু করলেন। পরিবার উপলব্ধি করল, মানুষ শুধু উপার্জনের যন্ত্র নয়Ñতার মূল্য তার অস্তিত্বে, তার স্নেহ-ভালোবাসায়, উপার্জনে নয়।
রফিক সাহেব আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, তবে এবার শান্তির। তিনি জানেন, হাত অবশ হলেও, তিনি আজও এই পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই গল্পটি আমাদের এটাই শেখায় যে, শারীরিক অক্ষমতা কোনো ব্যক্তির মূল্য নির্ধারণ করে না। পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব হলোÑঅর্থ উপার্জনে অক্ষম হলেও একজন মানুষকে সমাদর, সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়া, কারণ মানবিকতা আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি।
বুধবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৫















