
গ্রামের এক কোণে, সবুজ মাঠের ধারে ছোট্ট একটি বাড়িতে থাকতেন জন ম্যাথু। বয়স ষাটের কাছাকাছি হলেও তার হাসি আর হৃদয়ের উষ্ণতা তাকে তরুণ মনে হতো। জন ছিলেন একজন খ্রিস্টান, গ্রামের গির্জায় নিয়মিত যেতেন, প্রার্থনা করতেন। তার ছোট্ট জমি আর দুটি গরু ছিল জীবিকার ভরসা। স্ত্রী মার্থা দশ বছর আগে মারা গেছেন, সন্তান ছিল না। তবে আত্মীয়-স্বজনের অভাব ছিল না। তার ভাইপো পিটার, ভাগ্নে জেমস আর দূর সম্পর্কের বোন মেরি ছিলেন তার খুব কাছের। সুখের দিনে তারা জনের বাড়িতে আসতেন, একসঙ্গে খ্রিস্টমাস উৎসব পালন করতেন, গির্জায় প্রার্থনা করতেন, হাসি-আড্ডায় সময় কাটত। জন তাদের মন থেকে আপন মনে করতেন।
কিন্তু জীবন সবসময় সুখের পথে চলে না। এক বর্ষায় নদীর বাঁধ ভেঙে জনের জমি তলিয়ে গেল। গরু দুটিও মরে গেল। রাতারাতি তার সব শেষ। দিন দিন অভাব বাড়তে লাগল। যিনি একসময় গ্রামের অভাবীদের সাহায্য করতেন, তিনি নিজেই অসহায় হয়ে পড়লেন। প্রথমে পিটার, জেমস আর মেরি এসে খোঁজ নিতেন, কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে তাদের আগমন কমে গেল। ফোন করলে পিটার বলত, “চাচা, আমি শহরে ব্যস্ত, ব্যবসার কাজ। তুমি একটু দেখো।” জেমসের ফোন বন্ধ থাকত। মেরি ফোন ধরলেও কথা এড়িয়ে যেত। জনের বুক ভারী হয়ে উঠল। তিনি ভাবলেন, “এরাই আমার আত্মীয়, তবে কেন এখন এত দূরে?”

একদিন জন জ্বরে পড়লেন। শরীর দুর্বল, পেটে খাবার নেই। তিনি পিটারকে ফোন করলেন, কিন্তু পিটার ব্যস্ততার অজুহাত দিলেন। জেমসের ফোন বন্ধ, মেরি উত্তর দিলেন না। জন প্রার্থনা করলেন, “হে ঈশ্বর, আমাকে পথ দেখাও।” ঠিক তখনই গ্রামের এক দূর সম্পর্কের প্রতিবেশী, এলিজাবেথ, খবর পেয়ে ছুটে এলেন। এলিজাবেথও খ্রিস্টান ছিলেন, কিন্তু জনের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। তবু তিনি জনের অসুস্থতার খবর শুনে চুপ থাকতে পারেননি।
এলিজাবেথ নিজের টাকায় ওষুধ কিনে আনলেন, রান্না করে জনকে খাওয়ালেন। গ্রামের ডাক্তার ডেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রাতে জনের পাশে বসে তিনি বাইবেল থেকে পড়লেন, “তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসো, যেমন আমি তোমাদের ভালোবেসেছি।” জন অবাক হয়ে বললেন, “তুমি আমার কেউ না, তবু এত করছ কেন?” এলিজাবেথ হেসে বললেন, “জন, খ্রিস্টের শিক্ষা তো ভালোবাসা আর সেবা। আত্মীয়তা রক্তে নয়, হৃদয়ে।”
কিছুদিন পর জন সুস্থ হলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যারা দুর্দিনে পাশে থাকে না, তাদের আত্মীয় বলে গণ্য করার দরকার নেই। পিটার, জেমস আর মেরির সঙ্গে তিনি আর যোগাযোগ রাখলেন না। তিনি বুঝলেন, আত্মীয়তা শুধু নামে নয়, কাজে আর হৃদয়ের টানে। এলিজাবেথ আর গ্রামের কিছু সাধারণ মানুষ, যারা গির্জায় একসঙ্গে প্রার্থনা করত, তারাই জনের সত্যিকারের আপন হল।
এখন জন আবার হাসেন। তার ছোট্ট বাড়িতে এলিজাবেথ আর গ্রামের মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। প্রতি রোববার গির্জায় গিয়ে তিনি প্রার্থনা করেন, “হে ঈশ্বর, যারা আমার পাশে ছিল, তাদের জন্য ধন্যবাদ।” তিনি বুঝেছেন, দুর্দিনে যারা এড়িয়ে চলে, তাদের ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। আর যারা হৃদয় দিয়ে পাশে থাকে, তারাই সত্যিকারের আত্মীয়।
শিক্ষা: আত্মীয়তা রক্তের সম্পর্কে নয়, হৃদয়ের ভালোবাসায় আর কাজের প্রমাণে। দুর্দিনে যারা পাশে থাকে, তারাই খ্রিস্টের শিক্ষার সত্যিকারের অনুসারী ও আপনজন।
বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫















