একটি ভাঙা স্বপ্নের গল্প

ক্ষুদীরাম দাস :

মেরি সর্বদা ছিল ক্লাসের উজ্জ্বল নক্ষত্র। কলেজের ফার্স্ট গার্ল, বুদ্ধিমতী, উচ্চাকাক্সক্ষী এবং সবার প্রিয়। তার চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা মেরি শৈশব থেকেই শিখেছিল কঠোর পরিশ্রম ও বিশ্বাসের মূল্য। তার বাবা পিটার, একজন গির্জার পাদ্রি, এবং মা এলিজাবেথ, একজন স্কুলশিক্ষিকা, তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন নিজের পথ তৈরি করতে। মেরি সেই পথে হেঁটেছিল দৃঢ় পদক্ষেপে। কলেজ শেষ করার পর সে একটি নামকরা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পায়। বছর না ঘুরতেই তার বেতন ছুঁয়ে ফেলে এক লাখ টাকা। সহপাঠীরা, বন্ধুরা, এমনকী শিক্ষকরাও তার প্রশংসায় মুগ্ধ। মেরি জানত, জীবনে সে যা চায়, তা পাওয়ার ক্ষমতা তার আছে।

কিন্তু জীবনের ছবি সবসময় উজ্জ্বল থাকে না। মেরির জীবনে এলো জন, একজন সাধারণ খ্রিস্টান পরিবারের ছেলে। জন ছিল শান্ত, সৎ এবং পরিশ্রমী। তার স্বপ্ন ছিল ছোট, কিন্তু গভীর। সে চাইত একটি সুখী পরিবার, একটি শান্ত জীবন। মেরির বাবা-মা জনকে পছন্দ করেছিলেন তার সরলতার জন্য। গির্জায় একটি সাধারণ অনুষ্ঠানে মেরি ও জনের বিয়ে হয়। মেরি ভেবেছিল, তার সফল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি জনের সঙ্গে সে একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলবে। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তাদের সম্পর্কে সূ² ফাটল ধরতে শুরু করে।

মেরির ব্যস্ত জীবন ক্রমশ তাকে জনের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তার কোম্পানির চাপ, প্রমোশনের দৌড়, আর সাফল্যের তাড়না তাকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে জনের সঙ্গে তার কথোপকথন কমতে থাকে। জন চাইত মেরি তার সঙ্গে সময় কাটাক, তার মনের কথা শোনুক। কিন্তু মেরি প্রায়ই বলত, “জন, আমার অনেক কাজ। তুমি তো জানো, আমার এই চাকরিটা কত গুরুত্বপূর্ণ।” জন চুপ করে থাকত, কিন্তু তার মনে একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল।

একদিন জন তার গোপন ইচ্ছার কথা বলতে চাইল। সে বলল, “মেরি, আমি ভাবছি আমরা একসঙ্গে একটা ছোট বাগান করি। তুমি জানো, আমার ছোটবেলায় আমার দাদির বাগানে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগত।” মেরি হেসে উঠল, “বাগান? সিরিয়াসলি, জন? তুমি এত বাচ্চা কেন? আমার কাছে এসবের সময় নেই।” জনের মুখটা মলিন হয়ে গেল। সে আর কিছু বলল না। এই ছোট ছোট উপহাস, অবহেলা, আর সময়ের অভাব ক্রমশ তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

মেরির অফিসে এলো জেমস। জেমস ছিল তার কলিগ, তার মতোই উচ্চাকাক্সক্ষী, এক লাখ টাকার বেতনের চাকরির মালিক। জেমসের কথায়, হাসিতে, আর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে মেরি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেত। জেমস তাকে বুঝত, তার সাফল্যের প্রশংসা করত, তার সঙ্গে ক্যারিয়ারের স্বপ্ন ভাগ করে নিত। অফিসের দীর্ঘ সময়, একসঙ্গে প্রজেক্টে কাজ করা, আর কফি ব্রেকের আড্ডায় তাদের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠল। মেরি জানত এটা ভুল, কিন্তু জেমসের সঙ্গে কথা বলার সময় সে একটা পূর্ণতা অনুভব করত, যা জনের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল।

জেমস একদিন বলল, “মেরি, তুমি অনেক বড় কিছুর জন্য তৈরি। তুমি আমার মতোই, আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু করতে পারি।” মেরির মনে হলো, জেমস তাকে সত্যিই বোঝে। তাদের সম্পর্ক গভীর হতে থাকল। তারা একসঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলÑএকটা জীবন, যেখানে তারা দুজনেই তাদের ক্যারিয়ারের শিখরে পৌঁছাবে। মেরি ভাবল, জেমসের সঙ্গে সে সত্যিকারের সুখ পাবে।

এর মধ্যে মেরি ও জনের একটি কন্যাসন্তান হলোÑলিলি। মেরি মনে মনে ভেবেছিল, লিলির জন্ম তাদের সম্পর্কে নতুন আলো আনবে। কিন্তু মাতৃত্বের দায়িত্ব এবং ক্যারিয়ারের চাপ তাকে আরও বেশি ব্যস্ত করে তুলল। জন লিলির দেখাশোনা করত, কিন্তু মেরির মন ছিল অন্যত্র। জেমসের সঙ্গে তার সম্পর্ক তখন আরও গভীর হয়েছে। সে জনের সঙ্গে সময় কাটানোকে বোঝা মনে করত। একদিন সে সিদ্ধান্ত নিলÑসে জনকে ডিভোর্স দেবে।

গির্জায় পাদ্রি এবং পরিবারের সামনে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল আলোচনা হলো। মেরির বাবা পিটার বললেন, “মেরি, বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। তুমি এটা ভাঙতে চাও কেন?” মেরি জবাব দিল, “বাবা, আমি জনের সঙ্গে সুখী নই। আমি জানি আমার জন্য আরও ভালো কিছু আছে।” তার মা এলিজাবেথ চুপ করে থাকলেন, কিন্তু তাঁর চোখে অশ্রæ ছিল। জন কিছুই বলল না। সে শুধু লিলিকে কোলে নিয়ে বসে থাকল। ডিভোর্সের কাগজে সই হয়ে গেল। মেরি ভাবল, এখন তার জীবন সত্যিই পূর্ণ হবে।

মেরি ও জেমসের সম্পর্ক তখন প্রকাশ্যে এসেছে। তারা বিয়ের পরিকল্পনা করতে শুরু করল। জেমস বলত, “মেরি, আমরা একসঙ্গে বিদেশে যাব। আমার কোম্পানি আমাকে আমেরিকায় পাঠাচ্ছে। তুমিও আমার সঙ্গে যাবে।” মেরির চোখে নতুন স্বপ্ন জ্বলছিল। কিন্তু লিলির দায়িত্ব তাকে কিছুটা বেঁধে রেখেছিল। সে ভাবল, সে লিলিকে নিয়েই নতুন জীবন শুরু করবে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন জেমসের আচরণে পরিবর্তন এলো। সে দূরে দূরে থাকতে শুরু করল। মেরি প্রশ্ন করলে সে বলল, “আমার কাজের চাপ বেশি। তুমি তো বোঝো।” কয়েক মাস পর সে জানাল, সে একাই আমেরিকায় যাচ্ছে। “মেরি, আমি ভেবেছিলাম আমরা একসঙ্গে যাব, কিন্তু এখন আমার ক্যারিয়ারটা বড়। তুমি তো বুঝবে।” মেরি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝল, জেমসের কাছে এটা কখনোই প্রেম ছিল না; এটা ছিল কেবল একটি সময়ের সম্পর্ক।

জেমস চলে যাওয়ার পর মেরির জীবন ভেঙে পড়ল। তার চাকরি ছিল, কিন্তু মনের শান্তি হারিয়ে গিয়েছিল। লিলির মুখের দিকে তাকালে তার নিজের ভুলগুলো তাকে তাড়া করত। সে আর শহরের ফ্ল্যাটে থাকতে পারল না। অবশেষে সে লিলিকে নিয়ে ফিরে গেল তার বাবার বাড়িতে। পিটার ও এলিজাবেথ তাকে আশ্রয় দিলেন, কিন্তু তাদের চোখে নীরব প্রশ্ন ছিল। “মেরি, তুমি কেন নিজের জীবন এভাবে নষ্ট করলে?” তারা কখনো এই প্রশ্ন মুখে বলেননি, কিন্তু মেরি তা বুঝতে পারত।

গির্জায় প্রার্থনার সময় মেরি প্রায়ই চুপচাপ বসে থাকত। তার মনে হতো, সে তার বিশ্বাস, তার পরিবার, এমনকী নিজেকেও হারিয়েছে। লিলি তার একমাত্র আলো ছিল, কিন্তু তার জন্যও মেরির মনে অপরাধবোধ ছিল। সে ভাবত, “আমি কি লিলির জন্য একটা ভালো মা হতে পারব?”

এক রবিবার গির্জায় পাদ্রি একটি উপদেশ দিলেন: “ভালোবাসা ধৈর্যের, শ্রদ্ধার, আর ক্ষমার। আমরা যখন নিজের চেয়ে বড় কিছু খুঁজি, তখন প্রায়ই হারিয়ে যাই। কিন্তু ঈশ্বর আমাদের ফিরে আসার পথ দেখান।” মেরি চোখের জল ফেলল। সে বুঝল, তার উচ্চাকাক্সক্ষা, তার স্বপ্ন তাকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু সে হারিয়েছে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসÑভালোবাসা, বিশ্বাস আর পরিবার।

মেরি এখন বাবার বাড়িতে থাকে। লিলি তার পাশে খেলছে, আর সে ভাবছে, কীভাবে সে তার জীবন আবার গড়ে তুলবে। জনের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই, কিন্তু মাঝে মাঝে সে লিলির মধ্যে জনের সরল হাসি দেখতে পায়। মেরি জানে, তার পথ কঠিন হবে, কিন্তু সে এবার ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ও শক্তি চায়, যাতে সে লিলির জন্য একটি ভালো মা হতে পারে।

জীবন তাকে শিখিয়েছে, সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে প্রায়ই আমরা হারিয়ে ফেলি সত্যিকারের সুখ। মেরির গল্প একটি শিক্ষাÑভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়া ছাড়া কোনো সম্পর্ক টিকে না, আর পরকীয়ার মিষ্টি প্রলোভন প্রায়ই ভাঙা স্বপ্নের পথে নিয়ে যায়।

শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড

You might like