
ক্ষুদীরাম দাস:
এক.
আমি তখনো হাইস্কুলের শেষ দিকে, ভবিষ্যতের ভেলায় পা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। রোববারের বিকেল, গীর্জার ঘণ্টা সবেমাত্র নিথর হয়েছে। আমার মা মার্থার আদেশ ছিলো জরুরি। মার্থা আমাকে এক প্যাকেট সযতেœ মোড়ানো পুরোনো বাইবেল নিয়ে যেতে বললো আমার পরমা সুন্দরী ভাবী মেরীর কাছে। মেরী, আমার বড়ো ভাইয়ের স্ত্রী, সে ছিলো শান্ত অথচ দীপ্তিময় এক নারীÑস্বর্গের কোনো ভাস্কর্য যেন মর্ত্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।

শহরের এ বিশেষ অংশটি ছিলো পুরোনো ইটের গাঁথুনি আর বড়ো বড়ো দেবদারু গাছের ছায়ায় মোড়া। পথটা সামান্য বাঁক নিয়ে যে জায়গায় গিয়েছে, সেখানেই সেই গুরুত্বপূর্ণ অফিসটি। আর অফিস সংলগ্ন বাড়িটিতে থাকতেন ঐ অফিসের কর্তা মহোদয়, জোনাথন। সম্পর্কে তিনি আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়; কিন্তু বিত্তশালী হিসেবেই এলাকায় সুপরিচিত। জোনাথন আর তাঁর স্ত্রী সারার সংসারে ছেলেমেয়ের অভাব ছিলো না। ছোট ছোট চারটি কন্যা সন্তান ছিলো তাদের, সবগুলোই যেন দেবদূত। তাদের অপরূপ সৌন্দর্য এমন ছিলো যে কারো চোখ একবার পড়লে আদর করতে চাইতো। তাদের ত্বক ছিলো দুধের মতো ধবধবে, আর চোখগুলো গভীর দীঘির মতোন।
আমি মেরীর বাড়ির দিকে হাঁটছিলাম, আমার কাঁধে বাইবেলের সামান্য ভার। মন ছিলো চঞ্চল, কারণ মেরীকে দেখলেই আমার মনে একধরনের শুদ্ধ আনন্দ জাগতো। কিন্তু জোনাথনের বাড়ির সামনে যেতেই আমার পদক্ষেপ সামান্য ধীর হলো।
গেট সংলগ্ন লনে, দু’টি মেয়ে খেলা করছিলোÑএকজনের নাম স্যামুয়েলা, জোনাথন ও সারার ছোট মেয়েদের একজন। স্যামুয়েলার বয়স হবে হয়তো চার কিংবা পাঁচ। তার একরাশ সোনালী চুল রোদের আলোয় ঝলমল করছিলো। সে হাসছিলো, আর সেই হাসি এতোটাই নির্মল ছিলো যে পৃথিবীর সমস্ত পাপ যেন এক লহমায় ধুয়ে মুছে গেলো। আমার মনে পড়লো জোনাথনের বাড়ির সামাজিক অবস্থান কতোটা সুরক্ষিতÑসেখানে যেকোনো বহিরাগতের প্রবেশাধিকার ছিলো নিয়ন্ত্রিত।
যদিও সম্পর্কে আমরা আত্মীয়, কিন্তু জোনাথন তাঁর পারিবারিক পরিমÐলে বাইরের কারো অনুপ্রবেশ বরদাস্ত করতো না। আমাদের সময়ে, বিশেষত রক্ষণশীল খ্রীষ্টান পরিবারগুলোতে, এ অদৃশ্য দেয়ালগুলো ছিলো এতোটাই স্পষ্ট যে তা ভঙ্গ করার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। বড়োদের সম্মান, আর শিশুদের নিরাপত্তাÑএ দু’য়ের মাঝখানে সমাজ যেন এক অলিখিত আইন খাড়া করে রেখেছিলো।
আমি স্যামুয়েলাকে দূর থেকে দেখছিলাম। ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টিতে কতোটা মনোযোগী, তা’ ওই শিশুর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। মননে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগলো; কিন্তু তার কাছে গিয়ে একটু আদর করে আসার সাহস আমার হলো না। সমাজের ঐ অদৃশ্য দেয়াল আমাকে থামিয়ে দিলো। আমাকে মনে রাখতে হয়েছিলো, সৌন্দর্যের উপভোগ আর ব্যক্তিগত আগ্রাসন এক কথা নয়। আমার হাতে কোনো চকোলেট বা খেলনা ছিলো না, আর থাকলেও হয়তো আমি দিতে পারতাম না অনুমতি ছাড়া। আমি কেবল দূর থেকে চোখ ভরে উপভোগ করছিলাম সেই স্বর্গীয় নির্মলতা।
আমি এগোলাম। মেরীর বাড়ির দিকে আমার মন টানছিলো, কিন্তু প্রকৃতির এ বিস্ময়কর সৃষ্টি আমাকে এক পলকের জন্যে হলেও আটকে দিলো। আমি জানতাম না, আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত পরেই এ পবিত্র স্থানে এক অপ্রত্যাশিত নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে, যা’ আমার মননে বহু বছর ধরে এক অবিস্মরণীয় রেখাপাত করে রাখবে।
দুই.
আমি যখন অফিস সংলগ্ন পথের ঠিক মাঝখানে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে প্রবেশ করলো এক অচেনা ভদ্রলোক। তাঁর নাম প্যাট্রিক, পরে জেনেছিলাম। প্যাট্রিক দেখতে মধ্যবয়স্ক, সাধারণ পোশাকে, কিন্তু চোখে একধরনের সরলতা ছিলো। তিনি হয়তো কোনো প্রয়োজনে অফিস এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো তিনি আপন মনে অন্য কোনো চিন্তায় মগ্ন।
তিনি জোনাথনের বাড়ির গেটের কাছাকাছি এসে হঠাৎ থমকে গেলেন। স্যামুয়েলা তখন একটি প্রজাপতির পিছনে ধাওয়া করছিলো, তার ছোট্ট ফ্রকটি বাতাসের তালে উড়ছিলো। স্যামুয়েলা হঠাৎ থেমে গেলো এবং ভদ্রলোক প্যাট্রিকের দিকে নিষ্পাপ চোখে তাকালো।
প্যাট্রিক সেই মুহূর্তে কী ভাবলো, আমি জানি না। হয়তো তাঁর মনে পড়লো নিজের ছোটবেলার কথা, বা হয়তো কেবলই এ শিশুর অপরূপ সৌন্দর্যে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে নিজের আবেগ আর সংবরণ করতে পারলেন না।
অতি সাবধানে, যেন একটি পবিত্র ফুল স্পর্শ করছেন, প্যাট্রিক হাঁটু সামান্য বাঁকা করলো। তিনি শিশুটির সমান হলেন না, কেবল ঝুঁকে তার ছোট্ট, গোল চিবুকটি আলতো করে স্পর্শ করলো তাঁর তর্জনী দিয়ে। খুব দ্রæত, এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে তাঁর আঙুল সরে এলো। মুখে কোনো অশ্লীলতা ছিলো না, চোখে ছিলো কেবলই একধরনের মুগ্ধতা। তিনি শিশুটিকে কোনো কথা বললেন না, কেবল মৃদু হাসলেন।
সেই সময়ে, জোনাথনের স্ত্রী সারা জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হয়তো তাঁর শিশুকন্যাকে লক্ষ্য রাখছিলেন। প্যাট্রিকের এ সহজ, মুহূর্তের কাজটিই তাঁর চোখে বড়ো এক অপরাধ হিসেবে ধরা দিলো।
“কে? এ লোকটা কে?” সারার তীক্ষè, আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর জানালার কাঁচ ভেদ করে যেন পথে আছড়ে পড়লো।
আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। এই এতোটুকু স্পর্শ! এতে এতো বড়ো কী হলো?
স্যামুয়েলা তখনো কিছুই বুঝতে পারেনি। সে হয়তো তার চিবুকে সামান্য স্পর্শের অনুভ‚তি নিয়ে আবার প্রজাপতির পিছু নিলো। কিন্তু প্যাট্রিকের মুখটা পলকে ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। তাঁর সেই সরল হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে সেখানে এক অবিশ্বাসের ছায়া নামলো। তিনি কি বুঝতে পারছিলেন, তিনি এক অলঙ্ঘনীয় সামাজিক দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন? তিনি কেবল নিরীহ সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে চেয়েছিলো; কিন্তু সমাজ তাকে অন্য চোখে দেখছিলো।
সারার চিৎকার শুনে অফিস থেকে এবং বাড়ি থেকে দু’জন লোক দ্রæত বেরিয়ে এলো। কিন্তু তাদের থেকেও দ্রæত বেরিয়ে এলো বাড়ির কর্তা জোনাথন। জোনাথন ছিলেন এক বিশালদেহী পুরুষ, তাঁর চোখে সব সময়ই এক কঠোর কর্তৃত্বের ছাপ ছিলো।
তিনি প্যাট্রিকের দিকে ছুটে গেলেন, তাঁর মুখমÐল ক্রোধে রক্তিম হয়ে গিয়েছিলো। তিনি এক মুহূর্তও প্যাট্রিককে কথা বলার সুযোগ দিলেন না।
তিন.
জোনাথন কাছে এসেই প্যাট্রিকের উদ্দেশ্যে তাঁর স্বরকে যতোটা সম্ভব তীক্ষè করে তুললো। তিনি দেদারসে অশ্রাব্য গালি বর্ষণ করতে লাগলেনÑযা’ শুধু প্যাট্রিকের জন্যে অপমানজনক ছিলো না, বরং ঐ পবিত্র লন এবং পরিবেশের জন্যেও ছিলো অত্যন্ত বেমানান।
“শয়তানের সন্তান কোথাকার! সাহস কতো! আমার মেয়েকে তুই স্পর্শ করিস? তোর মনের পঙ্কিলতা দেখানোর আর কোনো জায়গা পেলি না?” জোনাথন রাগে কাঁপছিলেন।
প্যাট্রিক, যিনি কিছুক্ষণ আগেও কেবল একটি শিশুর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন, এখন তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো তিনি নিজের অপরাধ বুঝতে পারছিলেন না। তিনি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, “না, না, আমি… আমি শুধু… কতো সুন্দর!”
কিন্তু জোনাথনের কানে কোনো যুক্তি প্রবেশ করছিলো না। তার কাছে প্যাট্রিকের নিরীহ ব্যাখ্যা কোনো ক্ষমা বা সহানুভ‚তির দাবি রাখতো না। তার কাছে এ স্পর্শ ছিলো তার পিতৃত্বের প্রতি, তার পারিবারিক নিরাপত্তার প্রতি এক চরম আক্রমণ।
ইতিমধ্যে, চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পথচারী, বাজারের লোক এবং অফিসের কর্মীরা জমায়েত হয়ে গিয়েছিলো। উপস্থিত জনতা একে অপরের দিকে চোখ চাওয়াচাওয়ি করছিলো। তারা তখনও পুরো ঘটনা কী হয়েছে তা’ জানতে পারেনি। কেবল একটি বিত্তশালী পরিবারের প্রধান একজন মধ্যবয়স্ক লোককে তীব্রভাবে অপমান করছেÑএ দৃশ্যই তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যে যথেষ্ট ছিলো।
কেউ কেউ ফিসফিস করে বলছিলো, “নিশ্চয়ই কোনো খারাপ মতলব ছিলো!” আবার কেউ কেউ জোনাথনকে বাহবা দিচ্ছিলো তার এ অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্যে। আমাদের সমাজে সাধারণত অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কমই থাকে, আর প্যাট্রিক এ ভিড়ের সামনে আরো বেশি অসহায় হয়ে পড়লো।
আমি মেরীর বাড়িতে পৌঁছালাম, কিন্তু আমার মন তখনো ওই পথের ধারে। মেরীকে বাইবেলটি দিয়ে আমি সংক্ষেপে ঘটনাটি বললাম। মেরী সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তাঁর সুন্দর মুখে একধরনের বিষণœতা ফুটে উঠলো।
“জোনাথন একটু বেশিই কঠোর হয়েছে, ড্যানিয়েল। এতে কোনো সন্দেহ নেই,” মেরী শান্তভাবে বললো। “শিশুরা হলো বাগানের ফুল। তাদের স্পর্শ করার আগে দশবার ভাবতে হয়। কিন্তু প্যাট্রিক ভদ্রলোকের চোখে যে কামুকতা ছিলো না, তা’ও স্পষ্ট। মনে রেখো, ড্যানিয়েল, কোনো কোনো সময় ভালো উদ্দেশ্যও ভুল সময়ে চরম বিপদের কারণ হয়। এ সমাজে অদৃশ্য দেয়ালের সম্মান রক্ষা করা জরুরি।”
মেরীর এই কথাগুলো আমার মননে নতুন এক জিজ্ঞাসা তৈরি করলো। প্যাট্রিক ভদ্রলোক কি শুধুই আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন? তিনি কি কেবল সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেয়েছিলো?
বহু বছর পর, যখন আমার বন্ধু – স্যামুয়েলার ভাই জনের কাছে আমি প্যাট্রিকের পরবর্তী জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে পারলাম, তখন আমার সন্দেহ দূর হলো। জন জানালো, প্যাট্রিক একজন সমাজসেবী ছিলেন, সারাজীবন তিনি শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একেবারেই নিরাসক্ত। তাঁর জীবনযাপন স্পষ্ট করে দিয়েছিলো যে সেই মুহূর্তের স্পর্শে কোনো কাম মনোবাসনা ছিলো না।
কিন্তু দÐটি বেশি হয়ে গিয়েছিলো। কেন? কারণ তিনি সেই অদৃশ্য দেয়াল অতিক্রম করেছিলেন। সেই দিন থেকে, আমার কাছে এই ঘটনাটি কেবল একটি সামাজিক বিতর্ক নয়, এটি হয়ে উঠলো ‘সীমানা’ আর ‘সম্মান’-এর এক গভীর দার্শনিক পাঠ।
চার.
সময় পার হয়েছে। আমি এখন আর হাইস্কুলের শেষ দিকে নেই, জীবনের মধ্যগগনে। জোনাথন আর প্যাট্রিকের সেই ঘটনা বহু পুরোনো স্মৃতি। কিন্তু আমার মননে এই ঘটনাটি বার বার ব্যবচ্ছেদ হয়ে ফিরে আসে। আজ আমি একজন সচেতন বাবা, সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক।
প্যাট্রিক সেদিন আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বোকা বনে গিয়েছিলো। কিন্তু ঐ আকর্ষণ গুরুতর অপরাধের দÐ পাওয়ার যোগ্য ছিলো কী? হ্যাঁ, অবশ্যই। কিন্তু কেন?
আমার মন আমাকে বারবার সেই শিক্ষকের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যিনি বলেছিলেন: প্রিয় বন্ধু, এ কাজটি আমরা কেউ যেন না করি। কোনো অপরিচিত শিশু, সেটির লিঙ্গ বিবেচ্য নয়, দয়া করে তার শরীর স্পর্শ করবেন না। নিজের লোভ সংবরণ করুন।
এখানে ‘লোভ’ মানে শুধু যৌন লোভ নয়। এখানে লোভ বলতে বোঝানো হয়েছেÑঅন্যের সীমানায় প্রবেশ করার মানবিক বাসনা, অন্যের ব্যক্তিগত পরিধিকে নিজের ইচ্ছামতো অতিক্রম করার প্রবৃত্তি। এ লোভ সংবরণ করাই মানুষের প্রথম আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক কর্তব্য।
আমি মনে করি, প্যাট্রিক বোকা বনেছিলেন কারণ তিনি ভুলে গিয়েছিলেন সেই ‘নির্দিষ্ট অদৃশ্য দেয়াল’-এর কথা। ইন্দ্রিয়ের এই দেয়ালগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রনে রাখার ঐশ্বরিক নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ দেয়াল অনতিক্রম্য। অতিক্রম করলে সমূহ বিপদ।
আমাদের সমাজে আমরা খুব সহজে কোনো কিছু ‘উপভোগ’ করতে চাই। কিন্তু আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি উপভোগ করবো না? না, সব কিছু আপনার উপভোগ করার জন্যে নয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য দূর থেকে উপভোগ করার বিধান রয়েছে, যেমন কোনো শিল্পী দূর থেকে একটি ভাস্কর্য বা চিত্রকর্মের তারিফ করে।
বাস্তবতা হলো, একজন শিশুর শরীর তার নিজস্ব সম্পত্তি। এটি তার বেড়ে ওঠার ব্যক্তিগত মন্দির। একজন প্রাপ্তবয়স্কের কোনো অধিকার নেই তার ব্যক্তিগত স্থানে প্রবেশ করার, এমনকি যদি তার উদ্দেশ্য প্রেমময়ও হয়। মজা করার জন্যে বা আদর করার জন্যেও সেই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কোমর বাঁকা করে বড়ো মানুষের মতো কথা বলুন দূরত্ব বজায় রেখেÑএটাই সম্মান।
পারলে পকেটে রাখা চকোলেট দিতে পারেন, কিন্তু অনুমতি সাপেক্ষেÑযদি অভিভাবক বা শিশুটি নিজে অনুমতি প্রদান করে। বিষয়গুলো খুবই অনুভ‚তিপ্রবণ। স্পর্শ একধরনের কর্তৃত্ব, যা’ শুধুমাত্র বিশ্বস্ত এবং দায়িত্বশীল অভিভাবকের হাতেই থাকার কথা। প্যাট্রিক সেই কর্তৃত্ব গ্রহণ করার চেষ্টা করেছিলেন, যা’ তার ছিলো না। আর এটাই ছিলো তাঁর প্রকৃত অপরাধ।
আমি এখন আমার কন্যা লিলিয়ানের দিকে তাকাই। আমার সেই ছোটবেলার ভাবনা যেন আজ লিলিয়ানকে কেন্দ্র করে আরো সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে: “আমার মা ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে যাচ্ছে।” এ ‘মা’ আমার কন্যা, যার শরীর আর মন প্রকৃতির অলঙ্ঘনীয় নিয়মে বিকশিত হচ্ছে। আমি দেখি, কতো দ্রæত ঘটনাগুলো ঘটছে একই বাড়িতে অথচ আমরা কেহ টের পাচ্ছি না। প্রাকৃতিক বিষয় কখনও দায়িত্বে অবহেলা করে না। ওরা অপ্রতিরোধ্য। শরীরের রসায়ন বসে থাকবে না।
লিলিয়ান এখন আমাকে প্রশ্ন করে, “আব্বু, তুমি কি আমাকে কোলে নিয়ে আর রাস্তায় যাবে না?”
আমি তাকে বলি, “মা, এ গ্রহের খোলা আসমান জমীনের আলো বাতাস তোমার শরীরে সরাসরি স্পর্শ করার সময় খুব কম। যে কদিন পারো মেখে নাও রোদ্রের উষ্ণতা, মুক্ত দক্ষিণা সমীর।” আমি জানি, তার শরীর এখন নতুন এক পর্বের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেÑএক মহা বিস্ময়ের দিকে সে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার দায়িত্ব এখন তাকে শুধু নিরাপত্তা দেয়া নয়, বরং তাকে বোঝানো যে তার শরীর কতোটা পবিত্র ও মহামূল্যবান।
পাঁচ.
আমার কন্যার বড়ো হয়ে ওঠা আমাকে শেখালো, সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা কেমন হওয়া চাই। একজন সচেতন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো, সেই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে সম্মান করা এবং তা’ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। শারীরিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, ভ্রƒণ অবস্থায় চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শিশুর স্তন তৈরি শুরু হয়ে যায়। এটি স্ত্রী পুরুষ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু কন্যা শিশুর এস্ট্রোজেন নিঃসরণের সাথে সাথে পনের থেকে পঁচিশটি দুগ্ধ নিঃসরণ নালিকা ডাল পালার মতো বিস্তৃত হতে শুরু করে। স্তনের চারপাশে শুধু ফ্যাট আর ফ্যাট। মহাবিশ্বের এক মহা বিস্ময় ধীরে ধীরে পুস্পের মতো বিকশিত হতে থাকে। আমি লিলিয়ানকে বোঝাই, এই পরিবর্তনের কারণ কী। এই নালিকাগুলো জালের মতো বিস্তৃত। এগুলোকে আমরা লোব আর অ্যালভিওলাই বলি। এই অ্যালভিওলাইগুলোই ভবিষ্যতে দুধ তৈরি করবে। এগুলো শক্ত হয়ে স্তনবৃন্তের নিপলে এসে উন্মুক্ত হয়। আর এরা যে একটি শক্ত বাঁধনে থাকে, তাকে বিজ্ঞানীরা ‘ক‚পার্স লিগামেন্ট’ নাম দিয়েছেন। এই লিগামেন্টই স্তনকে আকৃতি দেয়। নিপলের কালো চারপাশ হলো ‘অ্যারিওলা’। অ্যারিওলা কালো হবার কারণে নবজাতক শিশু মায়ের স্তনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অ্যারিওলার ঠিক নীচে সাইনাস, যা মহা জাংশন। এখানে মায়ের দুধ এসে জমা হয়।
আমি তাকে বলি, “লিলিয়ান, তোমার শরীরের প্রতিটা অংশ ঈশ্বর প্রদত্ত একটি নিখুঁত যন্ত্র। এখানকার মন্টগোমারী আর সিবেসিয়াস গ্রন্থিগুলো সদা সতর্ক পাহারায় নিয়োজিত, যেন ভবিষ্যতের দুধ জীবানুমুক্ত থাকে। এই গ্রন্থিগুলো নরম, যা শিশুদের স্তন পান করতে সাহায্য করে।”
আমার মা বড়ো হওয়ার সাথে সাথে শরীরও পাল্টে যাচ্ছে। আমরা বন্ধুর মতো খেয়াল রাখছি তো? এ প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে। তাই আমি আর আমার স্ত্রী সারা, আমরা লিলিয়ানের প্রতি যতœশীল। আমরা মনে রাখি, ঋতুস্রাবে নিম্নাঙ্গের যতœ আর দুগ্ধস্রাবের জন্যে স্তনের যতœ অপরিহার্য।
আমরা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনের কথা বলি। আমরা লিলিয়ানকে কখনোই কষ্টকর বেষ্টনী বুকে জড়াতে উৎসাহ দিই না। ঢিলে পোশাক আর স্বাস্থ্য সম্মত পুষ্টি নিশ্চিত করি। দামী খাবার কখনও পুষ্টি সম্মত নয়। অধিক শাক সবজি ও ফল স্তনের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। আমরা জানি, শারীরিক পরিবর্তন মানেই স্বাধীনতা হরণ নয়, বরং নতুন এক দায়িত্বের সূচনা।
একদিন আমি লিলিয়ানকে দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তী নেলসন ম্যান্ডেলার একটি উক্তি মনে করিয়ে দিয়েছিলাম, যা’ আমি এক লেখায় পড়েছিলাম:
“মা, তোমার বুকের মূল্য আর রূপ যেমন আকাশচুম্বী আকর্ষণীয় তেমনি মহামূল্যবান তরল খাদ্যের দরিয়া!”
এ কথাগুলো কেবল স্তনের শারীরিক কার্যকারিতা বোঝায় না; এগুলো বোঝায় নারী শরীরের মহিমা, তার সৃষ্টিশীলতা এবং তার প্রতি পৃথিবীর গভীর শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তা।
সেই দিনের প্যাট্রিকের ঘটনা এবং আজকের লিলিয়ানের বেড়ে ওঠার মধ্যে সংযোগ একটাইÑসীমানা এবং সম্মান। শিশুদের সৌন্দর্য উপভোগ করা উচিত, কিন্তু দূর থেকে, অদৃশ্য দেয়ালের বাইরে থেকে। যে স্পর্শ কেবল আদর নয়, বরং কোনো এক প্রচ্ছন্ন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তা’ অবশ্যই পরিহার্য। কারণ প্রতিটি শরীরই ঈশ্বরের দেয়া উপহার, এক পবিত্র মন্দির। আর এ মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করার অধিকার কেবল তখনই সুলভ, যখন সামাজিক ও ধর্মীয় সহজ বিধানে তা’ নির্দিষ্ট সময়ে অনুমোদিত হয়। এ পর্যন্ত অপেক্ষা করাই প্রকৃত শ্রদ্ধা।
সমাপ্ত
০২ ডিসেম্বর ২০২৫
















