
ক্ষুদীরাম দাস:
ডেভিডের সাথে মেরির বিয়ে হয়েছিলো আট বছর আগে। সেই দিনটা ছিলো একটা ছোটো গীর্জায়, যেখানে পাস্টর জনসন তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন। গীর্জার ভিতরটা লাল গোলাপের ফুল দিয়ে সাজানো ছিলো, আর বাইরে রোববারের সকালের রোদ্দুর মধ্যদিয়ে আলো পড়ছিলো। ডেভিড মেরির হাতে একটা লাল গোলাপ ধরিয়ে দিয়েছিলো আর ফিসফিস করে বলেছিলো, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ফুল। আমি তোমাকে কখনো ভাঙবো না। ঈশ্বরের সামনে প্রতিজ্ঞা করছি।” মেরি হেসেছিলো। সেই হাসিটা এখনো ডেভিডের চোখে ভাসেÑযেন সারা জগৎ হেসে উঠেছিলো সেদিন। পাস্টর জনসন তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিলেন, “যীশুর ভালোবাসার মতো তোমাদের ভালোবাসা যেন চিরকাল জ্বলে।”

প্রথম দু’টি বছর সত্যিই স্বপ্নের মতো কেটেছিলো। ডেভিড তখনো ছোটো কোম্পানিতে চাকরি করতো। প্রতি রোববার গীর্জায় যেতো দু’জনে হাত ধরে। পাস্টর জনসনের উপদেশ শুনতো, যেখানে তিনি বলতেন, “বিবাহ হলো ঈশ্বরের দান। একে যতœ করে রাখো, যেন ফুলের মতো ফুটে থাকে।” গীর্জার পর সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতোÑচার্চের যুবক-যুবতীদের সাথে গান গাইতো, বাইবেলের আলোচনা করতো। ডেভিড বাড়ি ফিরে মেরির হাতে একটা চকলেট বা ছোটো ফুল নিয়ে আসতো। মেরি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরতো। রাতে দু’জনে ছাদে বসে তারা দেখতো। মেরি বলতো, “জানো, আমার মনে হয় এ তারাগুলো ঈশ্বরের আশীর্বাদ আমাদের জন্যে জ্বলছে।” ডেভিড তার কপালে চুমু খেয়ে বলতো, “তুমি আমার তারা, আর ঈশ্বর আমাদের পথ দেখাচ্ছেন।”
গীর্জার সামাজিকতা তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিলো। প্রতিমাসে চার্চের পিকনিক হতো, যেখানে ডেভিড এবং মেরি অন্যান্য দম্পতিদের সাথে মিলে খেলাধুলো করতো। একবার পাস্টর জনসন তাদের সবাইকে ডেকে বলেছিলেন, “সমাজে থেকে আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। বিবাহের পথে যদি কোনো কাঁটা আসে, গীর্জার দরজা সবসময় খোলা।” মেরি তখন ডেভিডের হাত ধরে হেসে বলেছিলো, “আমাদের তো কোনো কাঁটা নেই। শুধু ফুল।” সেই সময়টা ছিলো এতো সুন্দর যে দু’জনেই ভাবতো, এটা চিরকাল থাকবে।
তারপর ডেভিডের চাকরি বদলালো। বড়ো কোম্পানি, বড়ো পদ, বড়ো বেতন। সঙ্গে এলো বড়ো চাপ। অফিস থেকে ফিরতে রাত দশটা-এগারোটা। ফিরে এসে খেতে বসে মুখ ভোঁতা। মেরি যতো যতœ করে রান্না করুক, ডেভিডের মুখে একটা “ঠিক আছে” ছাড়া আর কিছু উঠতো না। কথা বলতে গেলে বলতো, “আমি ক্লান্ত, পরে কথা হবে।” পরে কথা আর হতো না। গীর্জায় যাওয়াও কমে গেলো। প্রথমে মেরি ভেবেছিলো এটা কয়েকদিনের। তারপর মাস পেরিয়ে গেলো। মেরি তখনো হাসি মুখে অপেক্ষা করতো। কিন্তু রোববার গীর্জায় যাওয়ার সময় ডেভিড বলতো, “আজ অফিসের কাজ আছে। তুমি একা যাও।” মেরি একা গিয়ে পাস্টর জনসনের সাথে কথা বলতো। পাস্টর বলতেন, “ডেভিডকে বলো, ঈশ্বরের কাছে সময় দাও। বিবাহে যতœ দরকার।”
একদিন রোববারের সকালে মেরি গীর্জায় গিয়ে দেখলো চার্চের সামাজিক অনুষ্ঠান চলছে। অন্যান্য দম্পতিরা হাসাহাসি করছিলো। মেরি একা বসে ছিলো। পাস্টর জনসন তার কাছে এসে বললেন, “মেরি, তোমার মুখটা ফ্যাকাশে লাগছে। কী হয়েছে?” মেরি চোখ নামিয়ে বললো, “কিছু না, পাস্টর। ডেভিড ব্যস্ত।” পাস্টর হেসে বললেন, “ব্যস্ততা ঈশ্বরের দান, কিন্তু তা’ বিবাহকে খেয়ে ফেললে না। তোমরা দু’জনে আমার সাথে কথা বলো।” মেরি সম্মতি দিলো, কিন্তু ডেভিডকে বলতে গেলে সে বললো, “পাস্টরের সাথে কথা? আমি তো খ্রীষ্টান, কিন্তু এতো সময় নেই।”
প্রথমে মেরি সহ্য করতো। কিন্তু একদিন ডেভিড ফিরে এসে দেখলো মেরি টেবিলে খাবার দিয়ে বসে আছে। ঘড়িতে রাত এগারোটা। ডেভিড চেঁচিয়ে উঠলো, “এতো রাত পর্যন্ত খাবার গরম করে রাখো কেন? আমি তো বলেছি আমি খেয়ে নেবো!” মেরি চুপ করে বললো, “তুমি বলেছিলে আজ একটু তাড়াতাড়ি আসবে। আর আজ রোববার, গীর্জায় যাওয়ার কথা ছিলো।” ডেভিড প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে দিলো। “তোমার এ বোকা বোকা কথা আমি আর শুনতে পারছি না। গীর্জা, পাস্টরÑসবই ঠিক আছে, কিন্তু আমার জীবন চলছে না ওগুলো দিয়ে।” সেই রাতে মেরি প্রথম ডায়নিং টেবিলে মাথা রেখে কাঁদলো। কিন্তু কারো কিছু বললো না। মা ফোন করলে বলতো, “সব ঠিক আছে মা। ঈশ্বর সব দেখছেন।”
সেই সময় চার্চের সামাজিকতা মেরির জন্যে একটা আশ্রয় হয়ে উঠলো। প্রতি রোববার সে গিয়ে অন্যান্য মহিলাদের সাথে কথা বলতো। একজন বন্ধু, সারা, তাকে বলেছিলো, “মেরি, তোমার চোখে দুঃখ দেখছি। ডেভিডের সাথে কী হয়েছে?” মেরি হেসে বললো, “কিছু না। শুধু ব্যস্ত।” কিন্তু সারা বললো, “আমরা খ্রীষ্টান সমাজ। একে অপরকে সাহায্য করি। পাস্টরকে বলো।” মেরি চুপ করে রইলো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার ফুলটা শুকিয়ে যাচ্ছিলো।
এক বছর পর তাদের ছেলে হলোÑপিটার। মেরি ভেবেছিলো এবার হয়তো সব বদলে যাবে। গীর্জায় পিটারের ব্যাপটিজমের অনুষ্ঠান হলো। পাস্টর জনসন পিটারকে আশীর্বাদ করে বললেন, “এ শিশু ঈশ্বরের দান। তোমরা দু’য়ের যতেœ তাকে বড়ো করো।” ডেভিডও প্রথমে খুশি হয়েছিলো। চার্চের লোকেরা এসে অভিনন্দন জানালো। সামাজিক অনুষ্ঠানে সবাই পিটারকে নিয়ে খেলতো। কিন্তু বাড়িতে পিটার যখন রাতে কাঁদতো, ডেভিড বিরক্ত হয়ে বলতো, “ওকে চুপ করাও। আমার ঘুম হচ্ছে না। কাল অফিস।” মেরি রাতের পর রাত ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুরতো। চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছিলো। ডেভিড দেখতো না। গীর্জায় যাওয়ার সময় মেরি পিটারকে নিয়ে যেতো, আর পাস্টর বলতেন, “মেরি, তোমাকে একা দেখে দুঃখ হয়। ডেভিডকে বলো, পরিবার ঈশ্বরের কেন্দ্র।”
একদিন চার্চের একটা বড়ো সামাজিক অনুষ্ঠান হলোÑক্রিসমাসের আগে। সবাই গান গাইছিলো, শিশুরা খেলছিলো। মেরি পিটারকে নিয়ে গেলো। ডেভিড বললো, “আমি যাবো না। কাজ আছে।” সেখানে পাস্টর জনসন দম্পতিদের নিয়ে একটা আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, “বাইবেল বলে, স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসো যেমন খ্রীষ্ট গীর্জাকে ভালোবাসেন। যতœ দাও, নইলে ফুল শুকিয়ে যায়।” মেরি শুনে চোখে জল এলো। সারা তার কাছে এসে বললো, “মেরি, তুমি কাঁদছো কেন?” মেরি সব বলে দিলো। সারা বললো, “পাস্টরকে বলো। আমরা সবাই সাহায্য করবো।”
পরদিন মেরি পাস্টরের কাছে গেলো। পাস্টর শুনে বললেন, “মেরি, ঈশ্বর তোমাদের দু’য়ের জন্যে পথ দেখাবেন। ডেভিডকে ডেকে আনো। আমি কথা বলবো।” মেরি বাড়ি ফিরে ডেভিডকে বললো। ডেভিড রাগ করে বললো, “পাস্টর? চার্চের লোকেরা? আমার ব্যক্তিগত জীবনে হাত দেবে না। তুমি নিজে সামলাও।” মেরি চুপ করে রইলো। তার ফুলটা আরো শুকিয়ে গেলো।
একদিন মেরির জন্মদিন। সে সারাদিন অপেক্ষা করেছিলো। চার্চের বন্ধুরা ফোন করে শুভেচ্ছা জানালো। রাত দশটায় ডেভিড ফিরলো। হাত খালি। মেরি হাসি মুখে বললো, “আজ আমার জন্মদিন ছিলো জানো? গীর্জায় সবাই মনে করিয়ে দিয়েছে।” ডেভিড ভ্রƒ কুঁচকে বললো, “আরে হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম। কাল কিছু কিনে দেবো।” মেরি আর কিছু বললো না। রাতে শুয়ে শুয়ে কাঁদলো। পরদিন গীর্জায় গিয়ে সারাকে বললো, “আমি আর পারছি না।” সারা তাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “ঈশ্বর তোমাকে শক্তি দেবেন। আমরা প্রার্থনা করবো।”
এভাবেই দিন যেতে লাগলো। মেরির হাসি কমে গেলো। কথা কমে গেলো। সে চুপচাপ সংসার করতো। রান্না করতো। পিটারকে মানুষ করতো। ডেভিডের বন্ধু-বান্ধব এলে হাসি মুখে খাতির করতো। কিন্তু ডেভিডের সাথে আর আগের মতো কথা বলতো না। ডেভিড বুঝতে পারেনি। বরং বলতো, “দেখো, বিয়ে হওয়ার পর মেয়েরা এমনই হয়। গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করো।” চার্চের সামাজিক অনুষ্ঠানে মেরি একা যেতো। সবাই জিজ্ঞেস করতো, “ডেভিড কোথায়?” মেরি বলতো, “ব্যস্ত।” পাস্টর জনসন একদিন তাকে একা ডেকে বললেন, “মেরি, তোমার দুঃখ আমি দেখছি। ঈশ্বর বলেন, ক্ষমা করো, কিন্তু নিজেকে ভাঙতে দিয়ো না।”
তারপর এলো সেই দিনটা। ডেভিডের অফিসে প্রমোশন হলো। বড়ো পার্টি। বাড়িতে অনেক লোক এলোÑঅফিসের সহকর্মী, চার্চের কয়েকজন বন্ধু। মেরি সারাদিন রান্না করলো। সাজগোজ করলো। সবাই প্রশংসা করলো। পাস্টর জনসনও এসেছিলেন। তিনি ডেভিডকে বললেন, “প্রমোশন ঈশ্বরের আশীর্বাদ। কিন্তু পরিবারকে ভুলো না।” ডেভিড হেসে বললো, “হ্যাঁ, পাস্টর। সব ঠিক আছে।” রাতে সবাই চলে গেলো। ডেভিড মদ্যপ অবস্থায় মেরিকে ডেকে বললো, “তুমি আজকে খুব সুন্দর লাগছিলে। কিন্তু জানো, আমার বসের বউ অনেক স্মার্ট। তুমি একটু ওরকম হতে পারো না? চার্চের অনুষ্ঠানে আরো সক্রিয় হও।” মেরি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো, “আমি তো সেই মেরি, যাকে তুমি একদিন ফুল বলেছিলে গীর্জায়। ঈশ্বরের সামনে।”
ডেভিড হাসলো। “আহা, তুমি সবকিছু মনে রাখো। ওসব কলেজের প্রেম। এখন তো বাস্তব জীবন। গীর্জা, পাস্টরÑসবই ভালো, কিন্তু টাকার জগতে চলতে হয়।” সেই রাতে মেরি আর ঘুমালো না। সে ছাদে গিয়ে বসলো। যেখানে একদিন তারা দু’জনে তারা দেখতো। চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভাবলোÑআমি কী সত্যিই বদলে গেছি? নাকি আমাকে বদলে দেয়া হয়েছে? ঈশ্বর, তুমি কী দেখছো না?
পরদিন সকালে ডেভিড ঘুম থেকে উঠে দেখলো ব্রেকফাস্ট টেবিলে শুধু একটা চিঠি। “ডেভিড, আমি চলে যাচ্ছি। পিটারকে নিয়ে মায়ের কাছে। তুমি একদিন বলেছিলে আমি তোমার ফুল। কিন্তু ফুলকে যতœ না করলে সে শুকিয়ে যায়। আমি শুকিয়ে গেছি। তোমাকে আর দোষ দিচ্ছি না। শুধু একটা কথাÑযদি কখনো আবার কারো জীবনে আসো, তাকে ফুলের মতো যতœ করো। নইলে সে ভেঙে যাবে। আর সেই ভাঙা ফুলের দায় তোমারই থাকবে। গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করো। Ñমেরি”
ডেভিড চিঠি পড়ে হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। বাড়িটা ফাঁকা লাগছিলো। পিটারের খেলনা ছড়িয়ে আছে। মেরির আলনায় তার শাড়ি ঝুলছে। রান্নাঘরে তার হাতের গন্ধ এখনো লেগে আছে। ডেভিড প্রথমবার বুঝলোÑসে কী হারিয়েছে। সে দৌড়ে গেলো গীর্জায়। পাস্টর জনসনকে খুঁজে পেলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, “পাস্টর, আমি ভুল করেছি। মেরি চলে গেছে। আমাকে সাহায্য করুন।” পাস্টর শুনে বললেন, “ডেভিড, ঈশ্বর ক্ষমা করেন। কিন্তু তোমাকে নিজেকে বদলাতে হবে। প্রার্থনা করো। আমি তোমার সাথে যাবো।”
ডেভিড পাস্টরকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গেলো। মেরির মা দরজা খুললেন। ডেভিড কাঁদতে কাঁদতে বললো, “মা, আমি ভুল করেছি। আমাকে একটা সুযোগ দিন।” মেরি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চোখ লাল। কিন্তু মুখ শান্ত। সে বললো, “ডেভিড, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম বলেই এতোদিন সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আর পারছি না। আমার ছেলের সামনে আমি ভাঙতে চাই না। গীর্জার সামাজিকতায় আমি শক্তি পেয়েছি, কিন্তু তোমার অবহেলা সহ্য করতে পারিনি।”
ডেভিড মাটিতে বসে পড়লো। “মেরি, আমি বুঝতে পারিনি। আমি নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম। কিন্তু তুমি না থাকলে আমি কিছুই না। প্লিজ, ফিরে এসো। আমি প্রমাণ করবো। পাস্টর, আপনি বলুন।” পাস্টর জনসন বললেন, “মেরি, বাইবেল বলে ক্ষমা করো। কিন্তু ডেভিড, তোমাকে প্রমাণ করতে হবে। চার্চে এসো দু’জনে। আমরা সবাই সাহায্য করবো।” মেরি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো, “একটা শর্তে ফিরবো। তুমি যদি আমাকে আবার সেই মেরি বানাতে পারোÑযে হাসতো, যে গান গাইতো, যে তোমার জন্যে অপেক্ষা করতো। আর গীর্জায় আমাদের সাথে যাবে, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। তাহলে ফিরবো। কিন্তু এবার আর ভুল করলে আমি চিরকালের জন্যে চলে যাবো।”
ডেভিড মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। পাস্টর হেসে বললেন, “ঈশ্বর তোমাদের পথ দেখাবেন।”
তারপর থেকে ডেভিড বদলে গেলো। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতো। মেরির হাতে ফুল আনতো। রাতে পিটারকে বাইবেলের গল্প পড়তো। মেরির সাথে ছাদে বসে তারা দেখতো। প্রতি রোববার গীর্জায় যেতো দু’জনে। পাস্টর জনসনের কাউন্সেলিং নিতো। চার্চের সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতোÑপিকনিক, গানের অনুষ্ঠান, শিশুদের জন্যে খেলা। একদিন চার্চের একটা অনুষ্ঠানে ডেভিড মেরির হাত ধরে বললো, “জানো, আমি ভেবেছিলাম তুমি বদলে গেছো। কিন্তু আসলে আমিই তোমাকে বদলে দিয়েছিলাম। তুমি ফুল ছিলে। আমি তোমাকে জল দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। পাস্টর বলেছেন, খ্রীষ্টের ভালোবাসা এমনইÑক্ষমা করে আবার ফুটিয়ে তোলে।”
মেরি হাসলো। সেই পুরোনো হাসি। সে বললো, “ফুল আবার ফুটতে পারে। যদি যতœ পায়। আর ঈশ্বরের আশীর্বাদে।” চার্চের বন্ধুরা দেখে খুশি হয়ে বললো, “তোমরা আমাদের উদাহরণ।”
আজ আট বছর পরেও তারা ছাদে বসে। পিটার এখন বড়ো হয়েছে। সে জিজ্ঞেস করে, “মা, তুমি বাবাকে এতো ভালোবাসো কেন?” মেরি ডেভিডের দিকে তাকিয়ে হাসে, “কারণ বাবা আমাকে আবার ফুল বানিয়েছে। আর গীর্জার সামাজিকতা, পাস্টরের উপদেশÑসব মিলে আমাদের শক্তি দিয়েছে।” ডেভিড মেরির হাত শক্ত করে ধরে। মনে মনে বলেÑএই হাত আর কখনো ছাড়বো না। ঈশ্বর, তোমাকে ধন্যবাদ।
কয়েক মাস পর চার্চে একটা বড়ো অনুষ্ঠান হলোÑবিবাহের বার্ষিকী উদযাপন। পাস্টর জনসন সব দম্পতিদের ডেকে বললেন, “দেখো, ডেভিড এবং মেরির গল্প। তারা ভেঙে যাওয়ার কিনারায় ছিলো, কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায়, আমাদের সমাজের সাহায্যে আবার ফুটেছে। যতো যতœ করো, ততো ভালোবাসা বাড়ে।” সবাই তালি দিলো। ডেভিড মাইকে উঠে বললো, “আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু মেরির ক্ষমা, পাস্টরের উপদেশ, চার্চের সামাজিকতা আমাকে বদলে দিয়েছে। আজ আমরা সুখী।” মেরি তার পাশে দাঁড়িয়ে হাসলো। পিটারও সেখানে ছিলো, সে বললো, “বাবা-মা, আমি তোমাদের মতো হবো।”
সেই অনুষ্ঠানের পর থেকে ডেভিড এবং মেরি চার্চের অন্যান্য দম্পতিদের সাহায্য করতে লাগলো। তারা একটা গ্রæপ তৈরি করলোÑবিবাহের কাউন্সেলিং গ্রæপ। পাস্টর জনসন তাদের নেতৃত্ব দিলেন। প্রতি মাসে তারা মিলে আলোচনা করতো, কীভাবে বিবাহকে যতœ করতে হয়। একটা দম্পতি, যারা ঝগড়া করছিলো, তাদের ডেভিড বললো, “আমরাও এমন ছিলাম। কিন্তু ঈশ্বরের পথে ফিরে এসেছি। যতো সময় দাও, ততো ফুল ফুটবে।” মেরি যোগ করলো, “আর চার্চের সামাজিকতা ভুলো না। একা থাকলে ভেঙে যায়, কিন্তু সমাজে থাকলে শক্তি পাও।”
একদিন পিটারের স্কুলের অনুষ্ঠানে গিয়ে ডেভিড মেরির কানে ফিসফিস করে বললো, “তুমি এখনো আমার ফুল। আরো সুন্দর হয়েছো।” মেরি হেসে বললো, “কারণ তুমি যতœ করো। আর ঈশ্বর দেখছেন।” পিটার তাদের দেখে বললো, “আমিও একদিন এমন বিবাহ করবো। গীর্জায়।”
আজ তাদের জীবনটা একটা উদাহরণ চার্চের জন্যে। পাস্টর জনসন বলেন, “ডেভিড-মেরির গল্প দেখিয়ে দেয়, খ্রীষ্টান জীবনে ক্ষমা, যতœ এবং সমাজের ভ‚মিকা কতো গুরুত্বপূর্ণ। ফুল শুকিয়ে যায়, কিন্তু ঈশ্বরের জলে আবার ফুটে।” ডেভিড এবং মেরি এখনো প্রতি রাতে প্রার্থনা করে, হাত ধরে। আর মনে করেÑভালোবাসা ঈশ্বরের দান, যতœ না করলে হারিয়ে যায়, কিন্তু ক্ষমায় ফিরে আসে।
০৭ ডিসেম্বর ২০২৫















