ছোটগল্প: হরিশপুরের সেই রাত

ক্ষুদীরাম দাস:

এক
হরিশপুর গ্রামটি যেন ডাঙ্গাপাড়া, হালদারপাড়া আর সরকার পাড়াÑএই তিনটি স্বতন্ত্র জীবনের স্রোত নিয়ে গঠিত এক শান্ত জনপদ। বিশাল এক বটগাছের ছায়ায় ঢাকা বড় রাস্তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, যা গ্রামের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন বোনার প্রাথমিক ক্ষেত্র। তখন ফাল্গুন মাস, স্নিগ্ধ সকালের প্রথম প্রহরে ধানখেতের ওপর কুয়াশার এক পাতলা, রহস্যময় চাদর এখনো জড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এই শান্ত, ধ্যানমগ্ন পরিবেশে, প্রতিদিনের মতোই নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে তেরো বছরের রিয়া সরকার ঠিক সকাল সাতটায় তার মাটির বাড়ি থেকে স্কুলের পথে পা বাড়ায়।

রিয়ার বাবা, হরেন্দ্রনাথ সরকার, যিনি গ্রামের সাধারণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত একজন সরল মানুষ, তিনি মেয়ের দিকে স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্কুলের পথে দু’হাত জোড় করে এক পবিত্র প্রার্থনা উচ্চারণ করেন: “যাস বাছা, কালীঠাকুরের নাম নিয়ে যা’।”

প্রতিদিনের এই দৃশ্যটি হরেনবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস আর গভীর ভালোবাসার প্রতীক। রিয়ার মা লতিকা দেবী আর বড় বোন মিতালী, দু’জনেই মিলে যতেœ বানানো টিফিন বক্সটি তার হাতে তুলে দেয়। রিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে হাসে। সেই হাসিটি যেন ছিল এই ফাল্গুনের সকালের মতোই স্বচ্ছ, নির্মল এবং এক আলাদা দীপ্তিতে ভরাÑযে আলোয় তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস আর মেধা ঝলসে উঠতো। রিয়া নবম শ্রেণির এক উজ্জ্বল, মেধাবী ছাত্রী, যে শুধু বইয়ের পাতায় নয়, হৃদয়ের গভীরেও এক বিশাল স্বপ্ন লালন করে: সে বড় হয়ে ডাক্তার হবে এবং দুস্থ মানুষের সেবা করে তাদের মুখে হাসি ফোটাবে।

কিন্তু এই শান্ত গ্রাম্য পরিবেশের আড়ালে যে হিংসা আর লোভের কালো ছায়া ধীরে ধীরে ঘনীভ‚ত হচ্ছিল, তা রিয়া বা তার পরিবারÑকারোরই ধারণায় ছিল না। হালদারপাড়ার প্রভাবশালী আল-আমিন হালদার এবং তার স্ত্রী শারমিন, সঙ্গে তাদের বড় ছেলে রাজু, এরা মিলে দীর্ঘকাল ধরে রিয়ার বাবার সামান্য জমিজমা এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, রিয়ার নামে লেখা পৈতৃক সম্পত্তির দিকে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো লোভের চোখে তাকিয়ে ছিল। রিয়ার দাদু তার মৃত্যুশয্যায় শুয়ে, অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে তার প্রিয় নাতনির ভবিষ্যতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কিছু মূল্যবান জমি সরাসরি তার নামে লিখে দিয়েছিলেন। সেই জমি এখন বাজারের হিসেবে লক্ষাধিক টাকার সম্পত্তি, যা ছিল সেই লোভী চক্রের মূল টার্গেট। তাদের এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের জাল ধীরে ধীরে বুনছিল, আর রিয়া তার স্বপ্ন নিয়ে স্কুলের পথে হাঁটছিলÑঅজান্তে।

দুই
সেদিন ছিল ১৬ই ফেব্রæয়ারি, শীতের শেষ ও ফাল্গুনের শুরুর এক বিষণœ সন্ধ্যা। চারিদিকে দ্রæত অন্ধকার নামছিল। নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রিয়া সরকার সেই মুহূর্তে তার শান্ত ঘরের পড়াশোনার টেবিলে মনোযোগ দিয়ে বসেছিল। গভীর মনোযোগে সে কঠিন সব পাটিগণিতের অঙ্ক কষছিলো, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের প্রথম ধাপগুলি পার হওয়ার চেষ্টায় সে তখন মগ্ন। ঠিক সেই সময়, তার কাঠের দরজায় খুব অপ্রত্যাশিতভাবে একটি মৃদু টোকা পড়ল।

রিয়া কৌত‚হল নিয়ে দরজা খুলতেই দেখল, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একই স্কুলের ছাত্রী, একাদশ শ্রেণির রুনা হালদার আর তার ভাই কামরুল। রুনা ছিল আল-আমিন হালদারের ভাতিজি, তাই এই অপ্রত্যাশিত আগমনে রিয়া কিছুটা অবাক হলো।

রুনা মিষ্টি গলায়, কিন্তু গলায় একটা চাপা তাড়াহুড়োর ভাব নিয়ে বলল, “রিয়া, একটু আয় না, তোকে নিয়ে একটা খুব জরুরি কথা আছে। এখনই যেতে হবে।”

রিয়া এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করলো। রুনা তার পরিচিত হলেও তাদের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না যে সন্ধ্যাবেলা এভাবে জরুরি কথা বলার প্রয়োজন হবে। তবুও, সে ভাবল রুনা তো তার স্কুলের বড় দিদি, কোনো বিপদ বা সমস্যায় পড়েনি তো? এই সরল বিশ্বাস নিয়েই সে সতর্কতা শিথিল করলো এবং তাদের সঙ্গে বেরিয়ে এলো।

রুনা আর কামরুলের সঙ্গে হেঁটে রিয়া এগিয়ে গেল গ্রামের পরিচিত স্থান, শোভাগঞ্জ কলেজ মোড়ের মিনি-বিশ্বরোডে, যা সন্ধ্যাবেলাও কিছু মানুষের আনাগোনায় হালকা আলোকিত থাকত। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর দৃশ্যটি মুহূর্তে পাল্টে গেল। রাস্তার পাশে একটি মিশুক (অটোরিকশা) অপেক্ষা করছিল, যার ভেতরে থেকে রহস্যময়ভাবে আটজন বলিষ্ঠ চেহারার লোক দ্রæতগতিতে নেমে এলো।

রিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই, যেন আগে থেকে ঠিক করা এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যের মতো, একটি হাত বিদ্যুতের গতিতে রিয়ার নরম মুখটা চেপে ধরলো। আতঙ্কিত রিয়া চিৎকার করার জন্য মুখ খুলতে চাইলেও পারল না। তার চিৎকারটি গলার ভেতরেই রুদ্ধ হয়ে গেল, কারণ ততক্ষণে একজন লোক তার মুখে জোর করে একটি অপরিষ্কার গামছা ঢুকিয়ে দিলো, যা শ্বাসরোধ করার উপক্রম। পুরো ঘটনাটি ঘটলো চোখের পলকে, কোনো শব্দ হওয়ার সুযোগ না দিয়েই। তারপর, সেই মিশুকটি রিয়াকে নিয়ে গ্রামের চেনা পথ ছেড়ে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটলো, যেন এক নরকগামী যাত্রা শুরু হলো।

এদিকে, মেয়ের ফিরতে দেরি দেখে হরেন্দ্রনাথ সরকার আর তার স্ত্রী লতিকা দেবীর মনে উদ্বেগ শুরু হয়েছিল। খোঁজ নিতে নিতে, চারপাশের পাড়ায় খুঁজতে খুঁজতে তাদের দুশ্চিন্তা ভয়াবহ আতঙ্কে রূপ নিলো। তারা সমস্ত পরিচিত জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজলেন, কিন্তু রিয়ার কোনো হদিস পেলেন না। এভাবে গভীর উদ্বেগ আর নিদ্রাহীন অপেক্ষায় রাত গড়িয়ে বারোটা বাজলো।

পরদিন সকালে, অসহায় বাবা-মা শেষ ভরসা হিসেবে স্থানীয় থানায় একটি অপহরণের মামলা দায়ের করলেন। তাদের কাছে যে সামান্য তথ্য ছিল, তার ভিত্তিতে তারা সুনির্দিষ্টভাবে আল-আমিন হালদার, তার স্ত্রী শারমিন, বড় ছেলে রাজু, এবং রুনা ও কামরুলÑএই পাঁচজনের নাম উল্লেখ করলেন, যাদের জমির লোভের কথা তাদের অজানা ছিল না। সেই সঙ্গে তারা ‘অজ্ঞাত আরো কয়েকজন’-কেও মামলার অন্তর্ভুক্ত করলেন, যারা অপহরণের সময় গাড়িতে ছিল। এই মামলাটি ছিল এক অসহায় বাবার তার সন্তানের মুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ের প্রথম পদক্ষেপ।

তিন
অপহৃত তেরো বছরের রিয়াকে মিশুকটি প্রথমে যে স্থানে নিয়ে গিয়েছিল, সেটি ছিল সুন্দরগঞ্জের পরিচিত এলাকার বাইরে, একটি জনমানবহীন, পরিত্যক্ত ইটের ভাটা। জায়গাটি ছিল ধোঁয়া আর ভাঙা ইটের স্তূপে ভরা, যেন এক রুদ্ধশ্বাস নরককুÐ। কয়েকদিন সেখানে রাখার পর, নিজেদের ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাতে অপহরণকারীরা রিয়াকে আবার দ্রæত স্থানান্তর করলো। এই গোপনীয়তা বজায় রাখার শেষে, তারা রিয়াকে নিয়ে পৌঁছালো রংপুর জেলার একটি অজ্ঞাত গ্রামে, যেখানে অপেক্ষা করছিল আব্দুল হালদারের বাড়ি। এই আব্দুল হালদার ছিল মূল ষড়যন্ত্রকারী আল-আমিন হালদারের এক দূর সম্পর্কের বিশ্বস্ত ভাই, যার প্রধান কাজই ছিল এমন ঘটনায় মেয়েদের লুকিয়ে রেখে অপরাধীদের রক্ষা করা। এই বাড়িটিই হলো রিয়ার জন্য পরবর্তী ছয় মাস একুশ দিন ধরে চলা ভয়ংকর নির্যাতনের স্থায়ী জেলখানা।

বন্দিদশার প্রথম মাসটি ছিল রিয়ার জন্য এক সীমাহীন যন্ত্রণার সময়। সে পাগলের মতো কাঁদতো, চিৎকার করতো, তার বাবা-মা আর বাড়ির জন্য আকুলতা প্রকাশ করতো। কিন্তু ধীরে ধীরে, তার এই কান্না শুকিয়ে গেল, কারণ তার প্রতিটি প্রতিবাদই পরিণত হতো আরও কঠোর শাস্তিতে। আব্দুল হালদার এবং তার পরিবারের সদস্যরা তাকে মানসিক আঘাত দিতে শুরু করলো। তারা ঠান্ডা গলায় রিয়াকে বলতো: “তোর বাবা-মা আর খুঁজছে না। তারা তোকে ভুলে গেছে। তুই এখন আমাদের ঘরের বউ। এটাই তোর নতুন জীবন।”

প্রতিউত্তরে, রিয়া তার সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিবাদ জানাতো: “আমি বাচ্চা মেয়ে। আমার বয়স মাত্র তেরো। আমাকে ছেড়ে দাও, আমি বাড়ি যেতে চাই।” কিন্তু তার এই মানবিক আকুতি বা আর্তনাদের উত্তর আসতো শুধু নির্মম হাসি আর অসহনীয় শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে।

এই চক্রটি শুধু শারীরিক নির্যাতন করেই থামেনি, তারা তাদের আসল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আরও জঘন্য কৌশল অবলম্বন করলো। জোরপূর্বক তারা রিয়াকে দিয়ে কিছু আইনি কাগজে সই করিয়ে নিলো। তারা তাকে ভয় দেখালো: “যদি তুই এইগুলোতে সই না করিস, তবে তোকে মেরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবো। তোর মৃতদেহও কেউ খুঁজে পাবে না।” এই ভয়ংকর হুমকির মুখে রিয়া বাধ্য হলো সই করতে।

এছাড়াও, তারা মাঝে মাঝে ভিডিও ধারণ করতো। সেই ভিডিওতে রিয়াকে জোর করে মুখস্থ করানো বক্তব্য বলতে হতো: “আমি নিজের ইচ্ছায় এসেছি। কেউ আমাকে অপহরণ করেনি। আমি এখানেই ভালো আছি।” যদি সে এই মিথ্যে কথাগুলো বলতে অস্বীকার করতো, তবে তাকে খাবার না দিয়ে অভুক্ত রাখা হতো, অথবা হাত-পা বেঁধে দীর্ঘ সময় ধরে এক কোণে ফেলে রাখা হতো, যেন সে একটি জীবন্ত বস্তু নয়, কেবল একটি দাবার ঘুঁটি।

এই ভয়ংকর বন্দিদশার মধ্যেও, রিয়ার চাচা আল-আমিন আর চাচী শারমিন মাঝে মাঝে রংপুরের সেই বাড়িতে আসতো। তারা এসে রিয়াকে আরও বেশি চাপ দিতো। তারা মিথ্যে আশ্বাস দিতো: “তোর ছোট চাচাত ভাইয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে দিয়ে দেবো। তুই শুধু রাজি হ। তাহলেই তোকে এই বাড়ি থেকে মুক্তি দিয়ে আবার বাড়ি নিয়ে যাবো।” শোকে, ভয়ে আর অসহায়ত্বে কাঁদতে কাঁদতে রিয়া তখনও তার স্বপ্ন আর অধিকারের কথা বলার চেষ্টা করতো: “আমার বয়স তো মাত্র তেরো। আমি এখনও নাবালিকা। আমি পড়তে চাই, আমার জীবনটা ফিরিয়ে দাও।” কিন্তু শারমিন কেবল একটি নির্মম, শীতল হাসি হেসে বলতো: “পড়াশোনা করে কী হবে? তোর মাথায় এত স্বপ্ন! দরকার নেই ওসবের। আমাদের জমি আমরা নেবোই। তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।”

জমির লোভ কীভাবে একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন ধ্বংস করতে পারে, এই ঘরটি ছিল তারই নীরব, অন্ধকার সাক্ষী।

চার
বন্দিদশার ভয়াবহতা যখন তেরো বছরের রিয়ার জীবনের প্রতি সমস্ত আশা শেষ করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই এলো আরও এক গভীর অন্ধকার। চতুর্থ মাসে তার শরীরের স্বাভাবিক নিয়মে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এলো। ধীরে ধীরে, তার অপরিণত মন এক মর্মান্তিক সত্য উপলব্ধি করলোÑতার উপর হওয়া পৈশাচিক অত্যাচারের ফলস্বরূপ, তার গর্ভে একটি নতুন জীবন এসেছে, একটি সন্তান। এই অকল্পনীয় ঘটনা তাকে মানসিক ও আত্মিকভাবে আরও গভীরভাবে ভেঙে ফেললো। এক লহমায় তার নিষ্পাপ শৈশব হারানোর চরম ট্র্যাজেডি তার সামনে প্রকট হলো। সে ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে লাগলো, কিন্তু তার এই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার কথা কাউকে বলার বা প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ বা উপায়ই ছিল নাÑচারিদিকে কেবল ছিল ভয় আর কঠোর নজরদারি।

আব্দুল হালদারের বাড়িতে রিয়ার এই নতুন অবস্থা আরও জটিলতা সৃষ্টি করলো। আব্দুলের বউ, যে এই জঘন্য অপরাধের নীরব সহায়ক ছিল, সে রিয়াকে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে বললো: “চুপ করে থাকবি। একটি কথাও মুখ থেকে বের করবি না। মনে রাখিস, এটা এখন আর তোর একার নয়, এটা আমাদের পরিবারের সন্তান। এই নিয়ে কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করিস না।” এই হুমকি রিয়াকে এক অসহায় শিকলে বেঁধে ফেললো। সে এখন শুধু বন্দিনীই নয়, এক অনিচ্ছাকৃত ভবিষ্যতের মা, যার স্বপ্ন, স্বাধীনতা আর শরীরÑসবকিছুই যেন সেই লোভী চক্রের নির্দেশে চলছে।

এদিকে, হরিশপুর গ্রাম তখন শোকে ও হতাশায় ডুবে। রিয়ার বাবা হরেন্দ্রনাথ সরকার এবং মা লতিকা দেবী প্রতিদিন ভোর ও সন্ধ্যায় গ্রামের কালীঠাকুরের মন্দিরে যেতেন। চোখে জল আর বুকভরা বেদনা নিয়ে তারা দেবীর কাছে শুধু আকুল প্রার্থনা ও মানত করতেনÑযেকোনো মূল্যে যেন তাদের মেয়ে সুস্থ শরীরে ফিরে আসে। তাদের বড় মেয়ে মিতালীও শোক এবং প্রতিজ্ঞার এক মিশ্র অনুভ‚তি নিয়ে নিজের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সে নিজের পড়াশোনা, নিজের স্বাভাবিক জীবন বিসর্জন দিয়ে পাড়ায় পাড়ায়, পরিচিত-অপরিচিত সকলের কাছে দিনের পর দিন ঘুরে ঘুরেÑযদি সামান্যতম কোনো সূত্র বা রিয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়, সেই মরিয়া খোঁজ চালাতো।

কিন্তু অপহরণকারীরা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর। তারা আল-আমিনের সম্পত্তিগত প্রভাব খাটিয়ে রিয়াকে এমন এক দুর্গম গোপন আস্তানায় লুকিয়ে রেখেছিল যে, রিয়ার পরিবারের দায়ের করা অপহরণ মামলা সত্তে¡ও স্থানীয় পুলিশও প্রথম প্রথম তার কোনো হদিস বা সূত্র পাচ্ছিল না। মামলা চললেও তদন্তের গতি ছিল মন্থর, যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল বারবার তাদের পথ আটকে দিচ্ছিল। অপহরণকারী চক্র অত্যন্ত সুচতুরভাবে সমস্ত প্রমাণ নষ্ট করে চলেছিল।

অবশেষে, দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি সময় পর, তদন্তকারী দল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় খুঁজে পেলো। মামলার অন্যতম অভিযুক্ত, রুনা হালদারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের লোকেশন ট্র্যাকিং করে একটি অপ্রত্যাশিত গোপন সূত্র পাওয়া গেলো। এই সূত্র ধরে পুলিশ নিশ্চিত হলো যে রিয়ার অবস্থান সম্ভবত রংপুর অঞ্চলের সেই আব্দুল হালদারের বাড়িতেই।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, বিচক্ষণ পুলিশ অফিসার এসআই রুহুল আমীন তার বিশ্বস্ত এবং প্রশিক্ষিত পুলিশ টিমকে নিয়ে গভীর রাতের অন্ধকারে, সতর্ক পদক্ষেপে সেই রংপুর গ্রামের আব্দুল হালদারের বাড়িটি চারিদিক থেকে দ্রæত ও নিঃশব্দে সম্পূর্ণ ঘিরে ফেললেন। মুহূর্তের মধ্যে তারা জোর করে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং রিয়াকে উদ্ধার করলেন। পুলিশ যখন তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে, রিয়া তখন সাত মাসের গর্ভবতী। তার শরীর ও মনের ওপর চলা অকথ্য অত্যাচার এবং নির্মমতার নীরব সাক্ষী হয়ে ছিল তার গর্ভের সন্তানÑআর এই উদ্ধার ছিল একটি দীর্ঘ, বেদনাদায়ক সংগ্রামের প্রথম আলোর ঝলক।

পাঁচ
উদ্ধারের পর, রিয়ার জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হলো আদালতের এজলাসে। অসহায়, কিন্তু দৃঢ়চেতা রিয়াকে সেখানে নিয়ে আসা হলো তার জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য। তেরো বছরের মেয়েটি, যে তার ছোট জীবনে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা পার করেছে, সে আদালতের সামনে ভয়ঙ্করভাবে ভেঙে পড়লেও প্রতিটি কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরলো। সে তার অপহরণ থেকে শুরু করে রংপুর গ্রামের অন্ধকার ঘরে কাটানো প্রতিটি অমানবিক নির্যাতনের কথা, জোরপূর্বক সই করানোর ঘটনা, এবং লাগাতার মানসিক চাপের সম্পূর্ণ বিবরণ খুলে বললো।

চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরছিল, কিন্তু তার গলায় ছিল এক অদম্য প্রতিজ্ঞা। সে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মনের আসল ইচ্ছা প্রকাশ করলো: “আমি লেখাপড়া করতে চাই। আমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো এবং মানুষের সেবা করবো। যারা আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে, আমার শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই!”

রিয়ার এই ভয়াবহ জবানবন্দির ভিত্তিতে, পুলিশ তাদের তদন্তের গতি বাড়ালো। খুব দ্রæতই তারা আল-আমিন হালদার, তার স্ত্রী শারমিন, ছেলে রাজু, রুনা, কামরুল, এবং রংপুর গ্রামের আব্দুল হালদারসহ মোট দশজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করলো। তাদের কড়া আইনি প্রক্রিয়ার মুখে দাঁড় করানো হলো।

তবে এই লড়াই তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। পুলিশি হেফাজতে এই মূল আসামিরা ধরা পড়লেও, এই চক্রের সাথে যুক্ত কিছু অন্য আসামি তখনও ছিল পলাতক। এই পলাতক অপরাধীরা আড়াল থেকে রিয়া আর তার পরিবারের উপর অবিরাম চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। রিয়ার বাবার মোবাইলে বারবার অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসতো, যেখানে তাদের ভয়ঙ্কর হুমকি দেওয়া হতো: “মামলা তুলে নে, নইলে মনে রাখিস, তোদের সবাইকে মেরে ফেলবো। তোদের জীবন শেষ করে দেবো।” এই হুমকি সত্তে¡ও হরেন্দ্রনাথ সরকার তার মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।

শারীরিকভাবে মুক্ত হয়ে রিয়া এখন তার বাবা-মা এবং দিদি মিতালীর নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। সে এখন তার গর্ভের সন্তানের জন্মের জন্য অপেক্ষা করছেÑযে সন্তান তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের প্রতীক। কিন্তু এতকিছুর পরেও রিয়ার চোখে আর সেই পুরনো ভয় নেই। তার ভেতরের মেয়েটির স্থানে এখন এক শক্তিশালী লড়াকু নারী জন্ম নিয়েছে। সে দৃঢ় কণ্ঠে তার পরিবার এবং যারা তাকে সমর্থন করে, তাদের সামনে এক নতুন প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করে: “আমি লড়বো। আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো। আমি পড়বো। যতো কষ্টই আসুক না কেন, আমি ভেঙে পড়বো নাÑআমি মানুষের মতো মানুষ হবো।”

হরিশপুরের মানুষজন আজও এ পৈশাচিক ঘটনা নিয়ে ফিসফিস করে আলোচনা করে। তাদের মুখে বিস্ময় আর ধিক্কারের ভাষা: কেউ বলে, “জমির সামান্য লোভে এতোগুলো মানুষ মিলে একটি ছোট মেয়ের সঙ্গে এতোটা পৈশাচিক কাজও মানুষ করতে পারে?” কেউ প্রশ্ন করে, “টাকার জন্যে আপন চাচা-চাচীও এতোটা নীচে নেমে নাতনিকে এমন করলো?”

এ সমস্ত আলোচনার ঊর্ধ্বে, রিয়া এখন বাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। সে গভীরভাবে জানে, তার জীবনের লড়াই, তার স্বপ্ন পূরণের যুদ্ধ, তার ন্যায়বিচারের সংগ্রামÑএখনো শেষ হয়নি। কিন্তু সে হারবে না। এ নির্মম অভিজ্ঞতা তাকে ভিতরের দিক থেকে আরো মজবুত করেছে। সে হারবে না। কখনো না।

বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

You might like