

ক্ষুদীরাম দাস
জোয়ানা রোববার সকালে গীর্জায় প্রার্থনা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলো। আকাশে হালকা মেঘের আড়ালে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছিলো, কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। সপ্তাহখানেক আগে তার মামা জনেটের জন্মদিনে যা শুনেছিলো, তা’ এখনো কানে বাজছিলো। জনেট বলেছিলেন, “এমন একটা বয়সে এসে দাঁড়িয়েছি যে আর জন্মদিনে কোনো গুরুজন নেই যাকে প্রণাম করতে পারবো। সবাই ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। এই বছর মাকে প্রণাম করতে গিয়ে ভাবলাম, ভাগ্যিস শাশুড়ি মার্থা আছেন, নইলে আর প্রণাম করার কেউ তো ছিলো না।”

জোয়ানার হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠেছিলো সেই কথায়। সে নিজেও তো একই অনুভ‚তিতে ভুগছিলো। আজকালকার যুবক-যুবতীরা কোথায় সেই প্রণামের চল? কাজের চাপ, ব্যস্ততা, সামাজিক মাধ্যমের ঝড়Ñসব মিলিয়ে ঐতিহ্যের সুতোটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। জোয়ানা তার ছোট্ট ফ্ল্যাটে পৌঁছে দরজা খুললো। ভিতরে তার স্বামী পল বসে কফি খাচ্ছিলো। “কী হলো, এতো দেরি কেন?” পল জিজ্ঞেস করলো।
“কিছু না। গীর্জায় একটু দাঁড়িয়েছিলাম। মার্থা আন্টির কথা মনে পড়ছিলো,” জোয়ানা বললো। পল হাসলো। “আজ রোববার, চলো না ওদের বাড়ি যাই। তোমার শাশুড়ি তো অপেক্ষা করছেন।” জোয়ানা মাথা নাড়লো। হ্যাঁ, সে যাবে। কিন্তু মনে মনে ভাবলো, কতোটা দেরি করে ফেলেছে সে। গত এক বছর সন্তানের জন্যে চেষ্টা করতে করতে, তারপর সিজারের অসুস্থতায় ঝোঁকা বন্ধ থাকায়, বাড়ির কোনো বড়কে প্রণাম করতে পারেনি। এখনো সময় আছে, ভাবলো সে।
পল আর জোয়ানা গাড়ি নিয়ে মার্থা আন্টির বাড়ির দিকে রওনা দিলো। রাস্তায় জোয়ানার চোখ পড়লো ছোট ছোট শিশুদের দলে। তারা রাস্তার ধারে খেলছিলো, কিন্তু কোথাও প্রণামের ছবি নেই। আগে তো প্রতি রাস্তার মোড়ে বড়রা বসতেন, শিশুরা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতো। এখন সবাই মোবাইলে আটকে। জোয়ানা পলকে বললো, “দেখো, এগুলো দেখলে মনে হয় সমাজটা কতোটা বদলে গেছে। প্রণাম করা মানে শুধু শারীরিক কাজ নয়, সম্মানের প্রতীক। কিন্তু আমরা সেটা হারিয়ে ফেলছি।”
মার্থা আন্টির বাড়িতে পৌঁছে তারা দরজায় টোকা দিলো। মার্থা দরজা খুলে হাসলেন। “এসো, এসো বাচ্চারা। এতোদিন পর এলে কেন?” জোয়ানা তৎক্ষণাৎ মার্থার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। মার্থা আশীর্বাদ দিলেন। পলও প্রণাম করলো। ভিতরে ঢুকে তারা দেখলো, জনেট আর তার স্বামী ডেভিডও এসেছেন। সবাই মিলে আড্ডা জমলো। কথায় কথায় জনেট বললেন, “জোয়ানা, তোমার মতো যুবতীরা যদি না জাগো, তাহলে এই প্রথা একদম শেষ হয়ে যাবে। আমার ছেলে রবার্ট তো এখনো আমাকে প্রণাম করে, কিন্তু তার বন্ধুরা হাসে। বলে, ‘আঙ্কল, এটা আউটডেটেড।’”
জোয়ানা চুপ করে শুনছিলো। তার মনে পড়লো তার দাদু জোসেফের কথা। দাদু গত বছর মারা গেছেন। শেষবার হাসপাতালে গিয়ে প্রণাম করেছিলো, কিন্তু দাদু জ্ঞানশূন্য ছিলেন। তবু সে প্রণাম করেছিলো। আজ বুঝতে পারে, সেটা ছিলো শেষ সুযোগ। মার্থা বললেন, “বাচ্চারা, প্রণাম শুধু আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়, এটা হৃদয়ের ভাষা। গীর্জায় যখন আমরা প্রভুর সামনে মাথা নত করি, তখনও তো প্রণামই করি। কিন্তু গুরুজনদের কাছে না করলে কী লাভ?”
সেদিন বিকেলে জোয়ানা ফিরে এসে তার পুরনো ডায়েরি খুললো। তার মধ্যে ছোটবেলার স্মৃতি লেখা। স্কুলের হেডমিস্ট্রেস সিস্টার রোজ, যিনি তাকে প্রথম শিক্ষা দিয়েছিলেন। রোজ সিস্টারকে শেষবার দেখেছিলো গীর্জার হাসপাতালে। উনি অচৈতন্য ছিলেন, কিন্তু জোয়ানা পায়ে হাত দিয়েছিলো। “ভাগ্যিস করলাম,” ভাবলো সে। এখন সেই স্মৃতি তার শক্তি।
পরের দিন জোয়ানা তার অফিসে গেলো। সে একটা এনজিও চালায়, যা যুবকদের জন্যে সামাজিক সচেতনতা প্রচার করে। তার কলিগ রিচার্ড বললো, “জোয়ানা, আমাদের পরবর্তী প্রোগ্রাম কী?” জোয়ানা বললো, “প্রণামের উপর। আমরা একটা ক্যাম্পেইন চালাবো। ‘প্রণাম করো, সম্মান ফিরিয়ে আনো’। খ্রিস্টান সমাজে তো গুরুজনদের প্রতি ভক্তি আছে, কিন্তু আধুনিকতার নামে হারিয়ে যাচ্ছে।”
ক্যাম্পেইন শুরু হলো। জোয়ানা প্রথমে তার নিজের পহিজের পরিবার নিয়ে একটা ছোট ভিডিও বানালো। তাতে সে বললো, “আমার মামা জনেটের কথা শুনে আমি জেগে উঠেছি। আমরা সবাই ব্যস্ত, কিন্তু প্রণামের মুহূর্তটা রাখবো না? এটা না করলে একদিন আমরাই বলবো, ‘কেউ নেই প্রণাম করার।’” ভিডিওটা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লো। অনেকে লাইক করলো, কমেন্ট করলো। কিন্তু কিছু যুবক বললো, “এটা পুরনো ধারণা। সময়ের সাথে বদলাতে হবে।”
জোয়ানা হাল ছাড়লো না। সে স্থানীয় গীর্জায় একটা সেমিনার আয়োজন করলো। সেখানে মার্থা, জনেট, ডেভিড সবাই এলেন। রিচার্ড মঞ্চে দাঁড়িয়ে বললো, “প্রণাম মানে শুধু পা ছোঁয়া নয়। এটা সম্মান, কৃতজ্ঞতা, আশীর্বাদের বিনিময়। আমাদের খ্রিস্টান ঐতিহ্যে তো বিশ্বাস আছে যে বড়দের আশীর্বাদে জীবন সফল হয়। কিন্তু আজকাল শিশুরা বড়দের এড়িয়ে যায়। কেন? ভয়? লজ্জা? না কি অহংকার?”
সেমিনারে একটা ছোট নাটক হলো। নাটকে রবার্ট, জনেটের ছেলে, দেখানো হলো কীভাবে সে তার বন্ধুদের সামনে মায়ের পায়ে প্রণাম করতে লজ্জা পায়। বন্ধু বলে, “আরে রবার্ট, এটা কী? আমরা তো করি না।” কিন্তু পরে রবার্টের দাদু জোসেফের স্মৃতিতে সে বুঝতে পারে, প্রণাম না করলে সুযোগ চলে যায়। নাটক শেষে দর্শকরা হাততালি দিলো। একজন বয়স্কা নানী, সিস্টার মেরি, বললেন, “আমি তো দেখছি, অনেক শিশু এখনো করে। কিন্তু যারা করে না, তাদের জন্যে এই সচেতনতা দরকার।”
জোয়ানা তার কাজে ফিরে এসে আরো বেশি করে চেষ্টা করতে শুরু করলো। সে স্কুলগুলোতে গিয়ে শিশুদের সাথে কথা বললো। একটা স্কুলে সিস্টার রোজের ছাত্রী ছিলো সে। সেখানে হেডমিস্ট্রেস সিস্টার অ্যানা বললেন, “জোয়ানা, তোমার কথা শুনে আমার মনে পড়লো আমার শিক্ষক সিস্টার লুসির কথা। উনি চলে গেছেন, কিন্তু শেষবার প্রণাম করেছিলাম। সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভাগ্য।” শিশুরা শুনছিলো। একটা ছেলে, টমি, বললো, “ম্যাম, আমি তো আমার দাদুকে প্রণাম করি। কিন্তু বন্ধুরা হাসে।” জোয়ানা বললো, “হাসুক। এটা তোমার সম্মান। যাদের কাছে মাথা নত করা উচিত, তাদের কাছে করো।”
সময় গড়িয়ে গেলো। জোয়ানার ক্যাম্পেইন ছড়িয়ে পড়লো পুরো শহরে। স্থানীয় গীর্জায় রোববার প্রতি প্রার্থনার পর শিশুরা বড়দের প্রণাম করতে শুরু করলো। মার্থা আন্টি বললেন, “দেখো জোয়ানা, তোমার প্রচেষ্টায় সমাজ জেগে উঠছে।” কিন্তু একটা ঘটনা ঘটলো যা সবকিছুকে আরো গভীর করে তুললো।
জনেটের ছেলে রবার্টের দাদু ডেভিডের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেলো। হাসপাতালে ভর্তি। জোয়ানা সবাইকে নিয়ে গেলো। রবার্ট আগে লজ্জা পেতো, কিন্তু এবার সে দাদুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। ডেভিড চোখ খুলে বললেন, “বাবা, তুই প্রণাম করলি? ভাগ্যিস করলি। এটা আমার শেষ আশীর্বাদ।” সেইদিনই ডেভিড চলে গেলেন। রবার্ট কাঁদতে কাঁদতে বললো, “জোয়ানা আন্টি, তোমার কথা না শুনলে আমি শেষ প্রণাম করতে পারতাম না। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।”
এই ঘটনার পর ক্যাম্পেইনটা জাতীয় স্তরে ছড়িয়ে পড়লো। খ্রিস্টান সমাজের নেতারা সমর্থন করলেন। গীর্জায় বিশেষ দিনে ‘প্রণাম দিবস’ পালন করা হতে লাগলো। জোয়ানা একটা বই লিখলো, ‘প্রণামের সৌভাগ্য’। তাতে সে লিখলো, “প্রণাম করা যেমন ভাগ্য, প্রণাম পাওয়াও তেমনি। কিন্তু সময় নির্দিষ্ট। যারা আজ আছেন, তাঁদের কাছে যাও। নইলে একদিন পস্তাবে, ‘কেউ নেই।’”
এক বছর পর জোয়ানা তার প্রথম সন্তানকে জন্ম দিলো। হাসপাতাল থেকে ফিরে সে মার্থা আন্টিকে প্রণাম করলো। তার ছোট্ট ছেলে জনকে হাতে নিয়ে বললো, “দেখো আন্টি, এও শিখবে প্রণাম করতে।” মার্থা হাসলেন। সমাজ বদলাচ্ছিলো ধীরে ধীরে। শিশুরা আবার বড়দের পায়ে হাত দিচ্ছিলো। প্রণামের সেই মধুর ঐতিহ্য ফিরে আসছিলো।
জোয়ানা জানতো, এটা একটা যুদ্ধ। আধুনিকতার ঝড়ে ঐতিহ্য হারিয়ে যায় না যদি আমরা লড়ি। প্রণাম করতে পারাটা সৌভাগ্য, এবং সচেতনতা ছড়াতে পারাটা তো আরো বড় দায়িত্ব। গীর্জার ঘণ্টা বাজতে লাগলো, আর সেই সাথে সমাজের হৃদয়ও জেগে উঠলো।
=সমাপ্ত=
শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫















