

ক্ষুদীরাম দাস:
চাঁদপুরের মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত সেই ছোট্ট হোটেলটি সন্ধ্যার আলোয় যেন জাদুকরী হয়ে উঠেছিলো। নদীর হাওয়া ভেসে আসছে ইলিশ ভাজার সুমধুর গন্ধ নিয়ে। রাহুল আর তার তিনজন বন্ধুÑঅমিত, রাজু আর সৌম্যÑএকটা দীর্ঘ ট্রেন যাত্রার পর এখানে এসে পৌঁছালো। চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার পর রাহুলের মনটা ভারী ছিলো। বন্ধুরা তাকে খুশি করার জন্যে এই ইলিশ খাওয়ার প্ল্যান করলো। চাঁদপুরের ইলিশ তো বিখ্যাত, সেই স্বাদ ভুলতে পারে কে?

তারা চারজন একটা টেবিলে বসলো। চাকরি এলো, ঝটপট ইলিশ ভাজা পরিবেশন করলো। রাহুল প্রথম কামড় দিলো। ওহ, কী স্বাদ! ভাজার সোনালি রঙ, মাছের রসালো মাংস, আর মশলার ঝালÑসব মিলিয়ে যেন স্বর্গীয়। বন্ধুরা হাসতে হাসতে খেতে লাগলো। “এই স্বাদের জন্যে চাঁদপুরে আসা যায়,” বললো অমিত। রাহুল হাসলো, কিন্তু তার মনটা এখনো ভারী। চাকরি গেছে, ভবিষ্যৎ কী হবে?
এমন সময় সামনের টেবিলে চারটি মেয়ে বসলো। তারা হাসাহাসি করে ইলিশের অর্ডার দিলো। রাহুলের চোখ পড়লো তাদের দিকে। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে এতো রূপসী যে ভাবাই যায় না। তার চোখ দুটি কাজল মাখা, ঠোঁটে হাসির ছোঁয়া, আর চুলগুলো খোলা অবস্থায় কাঁধে ঝুলছে। সে ইলিশ ভাজা তুলে নিলো, একটা কামড় দিলো। খাওয়ার ভঙ্গিতে এতো মিষ্টতা যে রাহুলের চোখ ফেরানো গেলো না। ইলিশের স্বাদের চেয়ে তার হাসি, রূপ আর খাওয়ার দৃশ্যটি যেন হৃদয় ছুঁয়ে গেলো।
চোখে চোখ পড়লো। মেয়েটি লাজুক হাসি দিলো। রাহুলের শিরা-উপশিরা যেন কেঁপে উঠলো। হৃদপিÐটা জোরে জোরে ধুকপুক করতে শুরু করলো। বন্ধুরা লক্ষ্য করলো না, তারা ইলিশ খেয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো। কিন্তু রাহুলের মনটা সেই মেয়েটির কাছেই আটকে গেলো। সে কে? নাম কী? চাঁদপুরেরই না বাইরের?
খাওয়া শেষ হয়ে গেলো। মেয়েরা উঠতে উঠতে হাসলো। রাহুলের বন্ধু রাজু বললো, “কী রে, তোর চোখ আটকে গেছে কেনে?” রাহুল লজ্জা পেয়ে বললো, “কিছু না। চলো বিল দেই।” কিন্তু তার মন বলছিলো, সেই মেয়েকে আরো দেখতে ইচ্ছে করছে। তারা হোটেল থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে হাঁটতে লাগলো। রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে, নদীর জলে তার প্রতিবিম্ব পড়েছে। রাহুলের মনে সেই হাসি ভাসছে। “আহ, চাঁদপুরের ইলিশের সেই স্বাদ,” সে নিজেকে বললো, কিন্তু স্বাদটা এখন মেয়েটির স্মৃতিতে মিশে গেছে।
পরের দিন সকালে তারা আবার সেই হোটেলে গেলো। ব্রেকফাস্টের জন্যে। রাহুলের মনটা উৎসুক। হয়তো সেই মেয়েটি আসবে? কিন্তু আসেনি। বন্ধুরা বললো, “আজ চাঁদপুর ঘুরে আসি। মাছ মার্কেট দেখবি?” রাহুল রাজি হলো। মাছ মার্কেটে গিয়ে দেখলো, ইলিশের স্তূপ স্তূপ মাছ। নদী থেকে তাজা এসেছে। সেখানে সেই মেয়েটিকে দেখলো সে! সে তার বাবার সাথে মাছ কিনছে। রাহুলের হৃদয় আবার কেঁপে উঠলো। সে কাছে গেলো না, দূর থেকে দেখলো। মেয়েটি হাসছে, বাবার সাথে কথা বলছে। তার নাম জানা যায়নি, কিন্তু মনটা তার প্রতি টান অনুভব করছে।
বন্ধুরা লক্ষ্য করে বললো, “আবার সেই মেয়ে? কী ব্যাপার রে?” রাহুল হাসলো, “সত্যি বলবো? সেই রাতের হাসিটা ভুলতে পারছি না।” অমিত বললো, “তাহলে কথা বলে দেখ। জীবন তো একবার।” রাহুল ভাবলো, কিন্তু সাহস হলো না। তারা হোটেলে ফিরলো। সন্ধ্যায় আবার ইলিশ খাবে ভেবে গেলো।
সেই সন্ধ্যায় মেয়েরা আবার এলো। এবার মেয়েটি একা একটা কোণের টেবিলে বসলো। তার বন্ধুরা অন্যদের সাথে গল্প করছে। রাহুলের বন্ধুরা তাকে ধাক্কা দিলো, “যা, কথা বল।” রাহুল উঠলো। হাতে এক গøাস পানি নিয়ে গেলো। “এই… আপনার টেবিলে পানির গøাস পড়ে ছিলো। নিন,” বললো সে। মেয়েটি হাসলো, “ধন্যবাদ। আপনি কালকের সেই লোক?” রাহুল অবাক, “হ্যাঁ। আমি রাহুল। আপনার নাম?” “প্রিয়া। চাঁদপুরেরই থাকি। আপনারা বাইরের?” প্রিয়া জিজ্ঞাসা করলো।
কথা শুরু হলো। প্রিয়া বললো, “ইলিশের স্বাদ এখানকার অনন্য। আমার বাবা মাছের ব্যবসা করেন। প্রতিদিন খাই, কিন্তু কখনো ওভাবে কেউ তাকায়নি।” রাহুল লজ্জা পেলো, “আপনার হাসিটা এতো সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায় না।” প্রিয়া হাসলো, তার গাল লাল হয়ে গেলো। বন্ধুরা দূর থেকে দেখছে, হাসছে। সেই রাতে তারা অনেকক্ষণ গল্প করলো। প্রিয়ার জীবনের কথাÑডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, চাঁদপুর ছেড়ে ঢাকায় যাওয়ার ইচ্ছে। রাহুল বললো, “আমিও চাকরি ছেড়েছি। নতুন শুরু করবো।”
পরের দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কাটলো। রাহুলের বন্ধুরা দু’দিন পর চলে গেলো। কিন্তু রাহুল থেকে গেলো। প্রতিদিন সেই হোটেলে যায়, প্রিয়ার সাথে দেখা করে। তারা নদীর ধারে হাঁটে, ইলিশ খায়, গল্প করে। প্রিয়া বললো, “তোমার চোখে সেই প্রথম দিনের মতোই আলো আছে।” রাহুল বললো, “তোমার হাসিতে সেই ইলিশের স্বাদ মিশে গেছে।”
এক রোববার সকালে তারা নদীর বোট ভাড়া নিলো। মেঘনার জলে ইলিশ মাছ ধরছে লোকেরা। প্রিয়া বললো, “এই নদী আমার জীবন। তুমি এলে যেন নতুন স্বাদ এলো।” রাহুল তার হাত ধরলো। প্রথমবার। প্রিয়া লজ্জা পেলো না, হাতটা শক্ত করে ধরলো। বোট চলছে, চাঁদপুরের সবুজ পাড় দেখা যাচ্ছে। “প্রিয়া, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না,” বললো রাহুল। প্রিয়া বললো, “আমিও। কিন্তু আমার বাবা কী বলবেন?”
প্রিয়ার বাবা মাছের ব্যবসায়ী, রক্ষণশীল। রাহুল ভাবলো, কীভাবে বলবে? একদিন সাহস করে প্রিয়ার বাড়ি গেলো। ইটের বাড়ি, সামনে ফুলের বাগান। বাবা বসে আছেন। রাহুল নমস্কার করলো। “আমি রাহুল। প্রিয়ার সাথে দেখা করতে এসেছি।” বাবা কড়া চোখে তাকালেন, “কী চাও?” রাহুল সব খুলে বললোÑপ্রথম দেখা, ইলিশের হোটেল, ভালোবাসা। বাবা হাসলেন না, বললেন, “প্রিয়া আমার একমাত্র মেয়ে। তুমি কী করবে জীবনে?” রাহুল বললো, “চাকরি খুঁজছি। পারবো প্রমাণ করতে।”
বাবা চুপ করে রইলেন। প্রিয়া ভিতরে এসে বললো, “বাবা, তাকে সময় দিন।” বাবা বললেন, “ঠিক আছে। তিন মাস পর আসিস। ততোদিনে চাকরি করে দেখা যাক।” রাহুল খুশি হয়ে বেরিয়ে এলো। সে ঢাকায় ফিরলো, চাকরির জন্যে চেষ্টা শুরু করলো। প্রতি সপ্তাহে চাঁদপুর যায়, প্রিয়াকে দেখে। ফোনে কথা বলে। প্রিয়া বলে, “তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।”
তিন মাস কাটলো। রাহুল একটা ভালো চাকরি পেলো ঢাকায়, একটা কোম্পানিতে মার্কেটিং ম্যানেজার। সে আবার চাঁদপুর গেলো। প্রিয়ার বাবার কাছে গেলো। “দেখুন, আমি প্রমাণ করলাম।” বাবা হাসলেন, “ভালো। কিন্তু প্রিয়া ডাক্তার হবে। তুমি সাপোর্ট করবে কী?” রাহুল বললো, “অবশ্যই। একসাথে স্বপ্ন পূরণ করবো।”
সেইদিন থেকে তাদের সম্পর্ক আরো গভীর হলো। প্রিয়া মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো ঢাকায়। তারা দু’জনে ঢাকায় থাকতে শুরু করলো। প্রতি শুক্রবার চাঁদপুর যায়, ইলিশ খায় সেই হোটেলে। সেই হোটেলের মালিক এখন তাদের বন্ধু হয়ে গেছে। বলে, “তোমরা প্রথম দিন থেকে আমার হোটেলের জুড়ি।”
কিন্তু জীবন সহজ নয়। প্রিয়ার পড়াশোনা চাপের। রাহুলের চাকরির প্রেশার। একদিন ঝগড়া হলো। প্রিয়া বললো, “তুমি বুঝবে না আমার কষ্ট।” রাহুল বললো, “আমি তো তোমার জন্যে সব করছি।” দু’জনে কাঁদলো। কিন্তু পরের দিন আবার মিললো। নদীর ধারে বসে বললো, “আমরা একসাথে লড়বো।”
দু’ বছর কাটলো। প্রিয়া ডাক্তার হলো। রাহুল প্রমোশন পেলো। তারা বিয়ে করলো চাঁদপুরে, মেঘনার তীরে। বিয়ের দিন সেই হোটেল থেকে ইলিশ এলো। সবাই খেলো, হাসলো। রাহুল প্রিয়াকে বললো, “সেই ইলিশের স্বাদ এখনো মনে আছে। তুমি যেন সেই স্বাদ।”
বছর কয়েক পর তাদের একটি মেয়ে হলো। নাম রাখলো ইলিশ। কারণ, সেই স্বাদই তাদের জীবনের শুরু। প্রতি বছর তারা চাঁদপুর যায়, সেই হোটেলে বসে ইলিশ খায়। শিশুটি খায়, হাসে। রাহুল বলে, “দেখ প্রিয়া, সেই প্রথম দিনের মতোই।”
জীবনের সঙ্কটও এলো। রাহুলের কোম্পানিতে সংকট, অনেকাংশই লোক ছাঁটাই হলো। কিন্তু সে লড়লো। প্রিয়া সাপোর্ট করলো। “আমরা পারবো,” বললো সে। রাহুল নতুন চাকরি পেলো। প্রতিমাসে চাঁদপুর যায় তারা, সেই স্বাদ নেয়।
একদিন বুড়ো হয়ে তারা সেই হোটেলে বসলো। হোটেলের মালিকের ছেলে এখন চালায়। “আঙ্কেল, তোমরা এখনো আসো?” রাহুল হাসলো, “অবশ্যই। এই স্বাদ ভুলিনি।” প্রিয়া বললো, “আর সেই চোখে চোখ পড়ার মুহূর্তটাও না।” তারা হাত ধরে বসলো। নদীর হাওয়া এলো। চাঁদপুরের ইলিশের সেই স্বাদ এখনো তাদের ভালোবাসার স্বাদ।
শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫















