ছাইচাপা আগুন

ক্ষুদীরাম দাস:

আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা, যেনো প্রকৃতিও জানতো আবিরের জীবনে কী ঝড় আসতে চলেছে। সেদিন বিকেলে বাবা সেই যে ব্যাগ গুছিয়ে বের হলো, আর ফিরলো না। ছোট্ট আবির জানলার গ্রিল ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতো; কিন্তু সেই চেনা অবয়বটি আর কোনোদিন গলি দিয়ে হেঁটে আসেনি।

আবিরের মা, সুমনা, প্রথম কয়েকটা মাস পাগলের মতো সব আত্মীয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কিন্তু অভাবের দিনে আত্মীয়রাও অচেনা হয়ে যায়। যে সংসারে এতোদিন সচ্ছলতা ছিলো, বাবার চলে যাওয়ায় সেখানে নেমে এলো নিরেট অন্ধকার। ঘরে চাল নেই, বাড়িওয়ালার ভাড়ার তাগাদা, আর আবিরের স্কুলের বেতন বাকি। সাত বছরের আবির দেখতো, মা রাতের বেলা গোপনে আঁচল দিয়ে চোখ মোছে, আর তাকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে বলে, “ভয় নেই বাবা, আমি তো আছি।”

কিন্তু শুধু “থাকা” দিয়ে পেট ভরে না। সুমনা প্রথমে সেলাইয়ের কাজ শুরু করলো, পরে অন্যের বাড়িতে ঠিকা ঝি-এর কাজ। কিন্তু তাতে দু’বেলা ঠিকমতো খাবার জুটতো না, আবিরের পড়াশোনা তো বিলাসিতা। আবির ছোট হলেও বুঝতো, মা খুব কষ্টে আছে। একদিন দুপুরে আবির দেখলো, মা ভাতের হাঁড়ি থেকে শেষ কয়েকটা দানা তার পাতে বেড়ে দিয়ে নিজে এক গøাস জল খেয়ে শুয়ে পড়লো। সেই দৃশ্য আবিরের শিশুমনে গভীর দাগ কাটলো।

দিন বদলাতে শুরু করলো মাস ছয়েক পর থেকে। সুমনা কাজ খুঁজতে বের হতো সকালে, কিন্তু ফিরতে শুরু করলো অনেক রাতে। প্রথমে সন্ধ্যা, তারপর রাত দশটা, কখনো বা আরো দেরি। আবির লক্ষ্য করলো, মায়ের হাতে এখন টাকা আসছে। ঘরে চাল আসছে, মাছ আসছে। আবিরের ছেঁড়া স্কুল ড্রেস বদলে নতুন ড্রেস এলো। তাকে ভালো এক প্রাইভেট টিউটরের কাছে ভর্তি করা হলো।

আবির খুশিই ছিলো। সে ভাবতো, মা হয়তো বড় কোনো কাজ পেয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে মায়ের চেহারা দেখে সে ভয় পেতো। রাতে বাড়ি ফেরার পর মায়ের বিধ্বস্ত মুখ, উষ্কখুষ্ক চুল, আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত ক্লান্তির ছাপ। মাঝে মাঝে মায়ের গা থেকে কেমন যেন কড়া সুগন্ধি আর অজানা উৎকট গন্ধ আসতো, যা’ আবিরের চেনা মায়ের গন্ধের মতো নয়। আবির জিজ্ঞেস করলে মা ¤øান হেসে বলতো, “অফিসে অনেক কাজ ছিলো রে বাবা, ধুলোবালির গন্ধ হয়তো।”

বছর গড়িয়ে আবির তখন নবম শ্রেণিতে। কিশোর বয়সের কৌত‚হল আর সমাজের ফিসফাস তার কানে আসতে শুরু করলো। পাড়ার চায়ের দোকানে, রকে বসা ছেলেদের আড্ডায় সে প্রায়ই তার মায়ের নাম নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি-তামাশা শুনতে পেতো। প্রথমে সে মারামারি করতো; কিন্তু একদিন এক প্রতিবেশী কাকিমা সরাসরি তাকে শুনিয়ে বললো, “মায়ের ওই রোজগারের টাকায় ফুটানি মারাস না, ওগুলো সব পাপের টাকা।”

আবিরের পৃথিবীটা দুলে উঠলো। পাপের টাকা? মা কী এমন করে?

সেদিন রাতে মা সেজেগুজে বের হচ্ছিলো। আবির পড়ার ভান করে বসে ছিলো। মা বেরিয়ে যেতেই সে গোপনে পিছু নিলো। শহরের এক প্রান্তে, যেখানে ভদ্রলোকেরা সচরাচর যায় না, সেই আলো-আঁধারিতে ঘেরা এলাকাটিতে মাকে ঢুকতে দেখে আবিরের পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেলো। সে দেখলো, তার মাÑযাকে সে দেবীর মতো জানেÑএকটি সস্তা হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে এক অপরিচিত লোকের সাথে দরাদরি করছে। লোকটা মায়ের হাত ধরলো, মা হাতটা ছাড়িয়ে নিলো না। তারা ভেতরে চলে গেলো।

আবিরের মনে হলো, তার বুকের ভেতরটা কেউ যেন এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ঘৃণা, লজ্জা আর অপমানে তার শরীর গুলিয়ে উঠলো। সে বমি করে দিলো রাস্তার পাশেই। দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলো সে। মনে হচ্ছিলো, এ ঘর, এ আসবাব, তার গায়ে পরা জামাÑসব কিছু নোংরা, সব কিছু অপবিত্র।

সেদিন রাতে মা ফিরলে আবির কথা বললো না। মা খাবার বেড়ে দিলে সে থালাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। সুমনা চমকে উঠলো, কিন্তু কিছু বললো না। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে সে সব বুঝে ফেললো। সেই রাত থেকে মা আর ছেলের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হলো।

আবির এরপর থেকে আর মায়ের দিকে তাকাতো না। মায়ের হাতের টাকা সে নিতে চাইতো না, কিন্তু নিতে বাধ্য হতো। প্রতিটা টাকা তার কাছে আগুনের মতো লাগতো। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, যতো দ্রæত সম্ভব সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং এ নরক থেকে পালাবে। মায়ের প্রতি তার সেই মুগ্ধতা ঘৃণায় রূপ নিলো। সে ভাবতো, “বাবা চলে গেছে বলে কি তোমাকে এতো নিচে নামতে হবে? তুমি ভিক্ষা করতে পারতে, তবু শরীর বেচতে গেলে কেন?”

উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর আবির শহরের বাইরে এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলো। সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দিন মা তাকে কিছু টাকা আর একটা নতুন শার্ট দিতে চেয়েছিলো। আবির রুক্ষ গলায় বলেছিলো, “তোমার ওসব নোংরা টাকা আমার লাগবে না। বৃত্তির টাকায় চলে যাবে।”

সুমনার হাতটা মাঝপথে থেমে গিয়েছিলো। ছেলের দিকে তাকিয়ে সে শুধু বলেছিলো, “সাবধানে থাকিস, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস।” আবির পেছন ফিরে তাকায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আবির টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতো। ছুটিতে সে বাড়ি ফিরতো না। কিন্তু চতুর্থ বর্ষে থাকার সময় একদিন খবর এলো, মা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। আবিরের ইচ্ছে ছিলো না যাওয়ার, কিন্তু বিবেকের তাড়নায় সে গেলো।

হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের এক কোণায় শীর্ণকায় এক নারী শুয়ে আছে। আবির প্রথমে চিনতেই পারেনি যে এটা তার মা। সুমনার শরীর ভেঙে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালি, চামড়া কুঁচকে গেছে। ডাক্তার আবিরকে ডেকে বললো, “ওনার শরীরে অনেক জটিলতা। দীর্ঘদিন অপুষ্টি, অনিয়ম আর… অত্যধিক শারীরিক ধকল ওনাকে শেষ করে দিয়েছে। ওনার লিভার আর কিডনি দু’টোই খুব ক্ষতিগ্রস্ত।”

আবির মায়ের বিছানার পাশে বসলো। মা ঘুমাচ্ছে। শিয়রে রাখা মায়ের পুরোনো ভ্যানিটি ব্যাগটা। কৌত‚হলবশত আবির ব্যাগটা খুললো। ভেতরে কিছু খুচরো টাকা, আর একটা পলিথিনে মোড়ানো কিছু কাগজ। আবির কাগজগুলো বের করলো।

সেগুলো আবিরের ছোটবেলার স্কুলের রেজাল্ট কার্ড, তার পুরস্কার জেতার সনদ, আর আবিরের বাবার একটা ছবিÑযা অনেক আগেই ছিঁড়ে ফেলা উচিত ছিলো। আর একটা ছোট ডায়েরি। আবির ডায়েরিটা খুললো। খুব অগোছালো হাতের লেখা।

“আজ আবিরের স্কুলের বেতন দিলাম। লোকটা খুব খারাপ ব্যবহার করেছে, গায়ে হাত দিয়েছে। খুব ঘেন্না লাগছিলো। বমি আসছিলো। কিন্তু যখন মনে পড়লো কাল আবিরকে স্কুল থেকে বের করে দেবে টাকা না দিলে, তখন সব সহ্য করে নিলাম। আমার ছেলেটা বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। ওর গায়ে যেন এ নোংরা সমাজের আঁচড় না লাগে, তার জন্যে আমি সব বিষ পান করতে রাজি।”

আরেক পাতায় লেখা, “আবির আজ আমাকে ঘৃণা করে। ও খাবার ফেলে দিয়েছে। আমার খুব কষ্ট হয়েছে, আবার আনন্দও হয়েছে। ভালোই হয়েছে ও আমাকে ঘৃণা করে। ও জানুক আমি খারাপ। তাহলে ও আমার মতো নোংরা পথ থেকে দূরে থাকবে। ওর ঘৃণা ওকে সৎ পথে রাখবে। ভগবান, তুমি আমার বিনিময়ে আমার ছেলেটাকে সুখী রেখো।”

পড়তে পড়তে আবিরের হাত কাঁপছিলো। চোখের জল ফোঁটায় ফোঁটায় ডায়েরির পাতায় পড়ছিলো। সে এতোদিন যা দেখেছে, তা ছিলো কেবল উপরের আবরণ। সে দেখেনি তার মায়ের এ ত্যাগের গভীরতা। মা তো নিজের সুখের জন্যে, বিলাসিতার জন্যে এ পথে নামেনি। সে নেমেছিলো কারণ সে চায়নি তার সন্তান না খেয়ে মরুক, সে চায়নি তার সন্তান অশিক্ষিত হয়ে বড় হোক। বাবার রেখে যাওয়া শূন্যতা আর সমাজের নিষ্ঠুরতার মাঝে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো তার মা। নিজের শরীরকে বর্ম বানিয়ে সে আবিরকে রক্ষা করেছে।

সমাজের চোখে মা ‘পতিতা’, কিন্তু আবিরের কাছে? আবির হঠাৎ উপলব্ধি করলো, এ নারী কোনো সাধারণ মানুষ নয়। ইনি একজন যোদ্ধা। যে যুদ্ধের ময়দানে রক্ত ঝরে না, ঝরে আত্মসম্মান। আর মা সেই আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েছে শুধু আবিরকে বাঁচানোর জন্যে। আবির আজ যা হয়েছেÑতার এ শিক্ষা, এ ভদ্রলোক সাজাÑসব তো এ মায়ের শরীর নিংড়ানো রক্ত-ঘামের ফসল।

মায়ের জ্ঞান ফিরলো। আবিরকে দেখে সুমনা দুর্বলভাবে হাসলো, যেন সংকুচিত হয়ে আছে। সে ভাবলো, ছেলে হয়তো এখনই চলে যাবে।

আবির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সে মায়ের শীর্ণ হাতটা নিজের গালে চেপে ধরলো। কান্নাজড়ানো গলায় বললো, “মা, আমাকে মাফ করে দাও। আমি কিচ্ছু বুঝিনি মা, আমি কিচ্ছু বুঝিনি।”

সুমনা অবাক হয়ে ছেলের মাথায় হাত রাখলো। তার মলিন চোখে জল এসে গেলো। সে বললো, “পাগল ছেলে, মায়ের ওপর কি রাগ করে থাকতে হয়?”

সুস্থ হওয়ার পর আবির মাকে নিয়ে সেই পুরোনো পাড়া ছেড়ে দিলো। সে এখন ভালো চাকরি করে। শহরের এক ভালো ফ্ল্যাটে মাকে নিয়ে উঠলো।

সমাজের মানুষ, আত্মীয়স্বজন তখন আবিরকে বোঝাতে এলো। “তোমার মা… ওনার অতীত তো ভালো না। তুমি বড় অফিসার হয়েছো, এখন ওনাকে সাথে রাখলে তোমার সম্মান যাবে। ওনাকে কোনো আশ্রমে দিয়ে দাও।”

আবির সেদিন সবার সামনে শক্ত গলায় বলেছিলো, “আপনারা যাকে ‘খারাপ মেয়ে’ বলছেন, তিনি আমার ঈশ্বর। তিনি নিজের জীবন পুড়িয়ে আমাকে আলো দিয়েছেন। আপনারা যখন নিন্দা করেছেন, তিনি তখন আমাকে খাইয়েছেন। আপনারা সমাজ বাঁচিয়েছেন, আর আমার মা আমাকে বাঁচিয়েছেন। আমার মা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র নারী। আমার সম্মানের চেয়ে আমার মায়ের আঁচলের দাম অনেক বেশি।”

আবির এখন প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মায়ের পাশে বসে। মা হয়তো আগের মতো সুন্দর নেই, শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে, কিন্তু আবিরের কাছে তার মায়ের মুখটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। সে জানে, এ পৃথিবী তাকে বিচার করবে, কিন্তু তার মায়ের ভালোবাসা কোনো বিচার মানে না। সেই ভালোবাসা শুধুই দিতে জানে, বিনিময়ে কিছুই চায় নাÑএমনকি সম্মানটুকুও না। কিন্তু আবির তাকে সেই সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে, সুদে-আসলে।

সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

You might like