সম্পাদকীয়: স্বাস্থ্য খাতের সংকট ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। সম্প্রতি হাম রোগে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং গোটা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার প্রতীক। অন্তর্বর্তী সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে টিকা কর্মসূচি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলেই শিশুদের টিকা না পাওয়া, রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম থমকে যাওয়া এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা ভেঙে পড়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

টিকা কর্মসূচির ভেঙে পড়া
১৯৭৯ সাল থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। হাম, রুবেলা, যক্ষা, পোলিওসহ একাধিক রোগ নিয়ন্ত্রণে এই কর্মসূচি ছিল মূল হাতিয়ার। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে ওপি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে টিকা সরবরাহে ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়।

– ২০২২ সালে যেখানে টিকা কভারেজ ছিল প্রায় ৯৮ শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৫৭ শতাংশে।
– এই পতন শুধু সংখ্যার নয়, বরং হাজার হাজার শিশুর জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
– হাম রোগে ইতিমধ্যেই ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা টিকা না পাওয়ার সরাসরি ফলাফল।

এটি প্রমাণ করে, জনস্বাস্থ্য খাতে ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে কত দ্রুত অর্জিত সাফল্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্ত
অপারেশন প্ল্যানগুলো শুধু টিকা নয়, বরং জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, এইডস প্রতিরোধ, কালাজ্বর নির্মূলসহ নানা কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি ছিল। এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে:

– জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা শত কোটি টাকা এখন কার্যত বিফলে গেছে।
– কালাজ্বর ও ফাইলেরিয়ার মতো রোগ, যা নির্মূলের পথে ছিল, আবার ফিরে আসার ঝুঁকিতে পড়েছে।
– স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের ৩২টি সুপারিশের কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ফার্মেসি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মতো কিছু উদ্যোগের কথা বলা হলেও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের ওষুধের খরচ কমেনি, বরং বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আঘাত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত হলেও অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে কিছুটা ভারসাম্য বজায় ছিল। ওপি বন্ধ হওয়ার ফলে:

– হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে, কিন্তু শয্যা ও ওষুধের সংকট তীব্র হয়েছে।
– চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন স্বাস্থ্যসেবাকে আরও অচল করে তুলেছে।
– জনগণের আস্থা ভেঙে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অনীহা তৈরি করতে পারে।

শিশু স্বাস্থ্য: সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত
শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জন্মের পর থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত আট ধরনের টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও হাজার হাজার শিশু তা পাচ্ছে না। এর ফলে:

– হাম, রুবেলা, পোলিওর মতো রোগ আবার ছড়িয়ে পড়ছে।
– শিশুমৃত্যুর হার বাড়ছে, যা দেশের উন্নয়ন সূচকে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।
– ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

করণীয়
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:

1. অপারেশন প্ল্যান পুনরায় চালু করা – টিকা কর্মসূচি ও রোগ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
2. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা – ইউনিসেফ, ইউএসআইডি ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে টিকা সরবরাহ দ্রুত করতে হবে।
3. স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন – দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
4. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা – স্বাস্থ্য খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক হঠকারিতা নয়, বরং বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
5. জনসচেতনতা বৃদ্ধি– জনগণকে টিকার গুরুত্ব বোঝাতে হবে এবং টিকা কর্মসূচি পুনরায় সচল হলে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ এক ভয়াবহ সংকটে। অন্তর্বর্তী সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে অর্জিত সাফল্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শিশুদের টিকা না পাওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং মানবিক বিপর্যয়। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে হাম, জলাতঙ্ক, কালাজ্বরের মতো রোগ আবার মহামারির আকারে ফিরে আসতে পারে।

জনস্বাস্থ্য কোনো সরকারের পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র নয়। এটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন। তাই স্বাস্থ্য খাতকে অচল করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের দায় অন্তর্বর্তী সরকারকে নিতে হবে। আর ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হলো—জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের গুরুত্ব কখনোই উপেক্ষা করা যাবে না।

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy